জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেললে ছাড় নয়: জামায়াত আমির

নিজস্ব প্রতিবেদন | প্রকাশ: ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম
জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেললে ছাড় নয়: জামায়াত আমির
ছবি : সংগৃহীত

জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ও সংসদে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, লংমার্চে কোনো বাধা এলে তা মোকাবিলা করেই গন্তব্যে পৌঁছাবেন তারা।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই লংমার্চের আয়োজন করে।

সকাল ৭টায় কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সমাবেশ শুরু হয়। পরে সমাবেশ শেষে সোয়া ৮টার পর গাড়িবহর চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আজ কোনো দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য রাস্তায় নামিনি; নেমেছি ১৮ কোটি মানুষের পক্ষে। আমাদের কর্মসূচির ওষুধ ইতোমধ্যে কাজ করতে শুরু করেছে, বিভিন্ন জায়গায় তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।’

তিনি বলেন, জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেললে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের সংকটের পাশাপাশি মানুষের কাছ থেকে নিয়মিত বিল নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘গ্যাস নাই, পানি নাই, ইলেকট্রিসিটি নাই। কিন্তু গ্যাসের বিলও যথারীতি আছে। কারেন্টের ভূতুড়ে বিল আছে।’

তিনি আরও বলেন, কোনো চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজের অস্তিত্ব বাংলাদেশে বরদাশত করা হবে না। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

১১ দলীয় জোটের এই কর্মসূচিতে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি তেল-গ্যাস ও সারের সংকট সমাধান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ ও দলীয়করণের রাজনীতি বন্ধ করা।

সমাবেশে ‘সিফাত’ নামে এক তরুণের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সিফাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং দলীয় সন্ত্রাসীরা থানায় গিয়ে তাকে নাজেহাল করেছে। তাকে ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি নূর হোসেন, ইয়াসমিন ও ডা. মিলনের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।

শফিকুর রহমান বলেন, প্রয়োজনে ১৮ কোটি মানুষ সিফাতের মতো প্রতিবাদী কণ্ঠ হয়ে গর্জে উঠবে।

সরকারের বিরুদ্ধে নাহিদের হুঁশিয়ারি

সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার যদি লংমার্চে বাধা দেয়, তাহলে ছয় দফা দাবি এক দফায় পরিণত হবে।

তিনি চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদক, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোয় জড়িত সিন্ডিকেট এবং গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া ম্যান্ডেটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলে সরকারের সমালোচনা করেন।

‘সরকার জনগণের কষ্ট দূর করতে পারেনি’

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার জনগণের কষ্ট দূর করতে ব্যর্থ হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যে অসংগতি দেখা যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তার দাবি, প্রথম সংসদ অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হলেও তা করা হয়নি। একইভাবে ছয় মাসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের যে সময়সীমার কথা বলা হয়েছিল, সেপ্টেম্বর এসে সেই সময়সীমাও শেষ হওয়ার পথে।

অলি আহমদের বক্তব্য

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, জনগণের মধ্যে বিএনপিকে আর ভোট না দেওয়ার মনোভাব তৈরি হয়েছে। তিনি গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে বিএনপি নেতা ফখরুল সাহেবের আগের বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

অলি আহমদ বলেন, ‘ফখরুল সাহেব এই বিল্ডিংয়ের পিছনে রয়েছেন’ বলে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, সেটির প্রসঙ্গও তিনি তোলেন। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদকে উদ্দেশ করে আগের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করেন।

দেশ পরিচালনার জন্য ঈমানদার মানুষকে বেছে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বেইমান, মুনাফেক ও বিদেশি এজেন্টদের দিয়ে দেশ পরিচালনা করা যাবে না। তার ভাষায়, প্রথম রাউন্ড শেষ হয়েছে, এখন দ্বিতীয় রাউন্ড শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ খিলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তিনি সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের আহ্বান জানান এবং তা না হলে পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেন।

পথে পাঁচটি পথসভা

লংমার্চের পথে পাঁচটি স্থানে পথসভা করার কর্মসূচি রয়েছে। প্রথম পথসভাটি নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোডের ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকায়। এরপর কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, নুরজান হোটেলের সামনে/চৌদ্দগ্রাম, ফেনীর মহিপাল এবং মীরসরাইয়ে পথসভা হওয়ার কথা রয়েছে।

পদুয়া বাজারে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পথসভা, এরপর জোহরের নামাজ ও খাবারের বিরতি রাখার কথা জানানো হয়েছে। বিকেলে চৌদ্দগ্রাম, মহিপাল ও মীরসরাইয়ে পথসভা হওয়ার কথা রয়েছে।

চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সন্ধ্যা ৭টার দিকে সমাপনী সমাবেশ হওয়ার সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন কারণে সময়সূচিতে পরিবর্তন হতে পারে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। কর্মসূচির কারণে জনসাধারণের সাময়িক ভোগান্তি হলে আগাম দুঃখ প্রকাশও করেছেন তারা।

সামনে আরও লংমার্চ ও মহাসমাবেশ

লংমার্চের পরবর্তী কর্মসূচির মধ্যে ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখী লংমার্চ, ১০ অক্টোবর শনিবার ঢাকা থেকে খুলনা অভিমুখী লংমার্চ এবং ২৪ অক্টোবর শনিবার ঢাকা থেকে সিলেট অভিমুখী লংমার্চের কর্মসূচি রয়েছে। সিলেটের কর্মসূচিটি রেলযাত্রার মাধ্যমে করার কথা রয়েছে।

এরপর ১৪ নভেম্বর শনিবার ঢাকায় মহাসমাবেশ করার ঘোষণা রয়েছে।

শনিবারের কর্মসূচির সমাবেশে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক এএইচএম হামিদুর রহমান আজাদ সভাপতিত্ব করেন।

এতে আরও বক্তব্য দেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ খিলাফত আন্দোলনের সেক্রেটারি জেনারেল মুফতি ফখরুল ইসলাম, জাগপা সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমির আবদুল কাইয়ুম সোবহানী এবং এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনসহ জোটের বিভিন্ন দলের নেতারা।

সমাবেশ পরিচালনা করেন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে