বর্ষাকাল কৃষিকাজের মূল চালিকা শক্তি

প্রকাশ ঘোষ বিধান | প্রকাশ: ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম
বর্ষাকাল কৃষিকাজের মূল চালিকা শক্তি
প্রকাশ ঘোষ বিধান

বাংলাদেশে কৃষিকাজের জন্য বর্ষাকাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আশীর্বাদস্বরূপ। প্রাকৃতিকভাবে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত আমন ধান, পাট এবং বিভিন্ন বর্ষাকালীন শাকসবজি চাষের জন্য জমি প্রস্তুত ও সেচের প্রয়োজনীয়তা দূর করে, যা গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে সচল রাখে।

ঋতুবৈচিত্র্যে বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। গ্রীষ্মের পর বর্ষাকাল দ্বিতীয় ঝতু। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশে প্রচুর বৃষ্টি হয়ে থাকে। আষাঢ় ও শ্রাবণ দুই মাস বর্ষাকাল হলেও বাংলাদেশে এ ঋতুর আগমন আগেই ঘটে এবং শেষ হয় দেরিতে। দেশে সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসে বর্ষা শুরু হয়ে আশ্বিন মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এসময় মাঠ-ঘাট,খাল-বিল ও নদী-নালা জলে পূর্ণ থাকে।

বর্ষাকাল বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঋতু। এই সময় দেশের প্রায় সব জায়গায়ই প্রচুর বৃষ্টি হয়। বর্ষার পানি কৃষিকাজের জন্য অপরিহার্য। এ সময় ধানসহ অন্যান্য শস্যের চাষ হয়। বর্ষায় নদী, বিল, হাওর ভরে ওঠে। জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য এটি আশীর্বাদ। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে যায় সব ময়লা-আবর্জনা। তরুলতা ও গাছপালা সতেজ হয়ে ওঠে। সবুজের ছোঁয়া, মনোরম পরিবেশ, নানা রঙের ফুল বর্ষা এনে দেয় প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য।

বর্ষাকাল বাংলাদেশের কৃষিকাজের মূল চালিকা শক্তি। বর্ষাকাল হলো মূলত প্রকৃতির আশির্বাদ, যা আউশ ও আমন ধান এবং বিভিন্ন বর্ষাকালীন সবজি চাষের জন্য পানির প্রাকৃতিক চাহিদা পূরণ করে। প্রাকৃতিক বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে এই মৌসুমে কম খরচে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়, যা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের প্রাণের স্পন্দন বর্ষাকাল। আমাদের দেশের প্রধান ফসল ধান চাষ পুরোপুরি এই মৌসুমের বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে। আউশ এবং আমন ধানের জন্য প্রচুর পানি লাগে। বর্ষার বৃষ্টি এই পানির অভাব দূর করে। বর্ষার নতুন পানিতে পাট গাছ জাগ দেওয়া বা পচানো সহজ হয়। বর্ষা ঋতুতে কৃষকরা আমন বীজতলা প্রস্তুত করেন। বীজ বোনার পর চারাগাছ তুলে তা রোপণ করেন। এ ঋতুতে আউশ ধান কাটা ও পাট কাটার উপযুক্ত সময়।

বর্ষাকালীন কৃষিতে বাংলাদেশের প্রধান ফসল ধান। তিনটি প্রধান ধানের মধ্যে দুটিই উৎপাদিত হয় বর্ষাকালে। এ মৌসুমে আউশ ও আমন ধানের চাষ হয়। আর বোরো ধানের চাষ হয় শীতকালে। মোট ধান উৎপাদনের দিক থেকে আউশের অবস্থান তৃতীয়, শতকরা আট ভাগ। আমন ধানের শরিকানা ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ মোট ধানের শতকরা ৪৬ ভাগ উৎপাদিত হয় বর্ষা মৌসুমে। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বোরো ধানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে অতিরিক্ত সেচনির্ভরতা ও উৎপাদন খরচের কারণে বোরো ধানের প্রতি কৃষকের আগ্রহ কিছুটা হ্রাস পাচ্ছে। আর আউশ ও আমনের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

বন্যার পানি জমিতে পলিমাটি নিয়ে আসে। এই পলিমাটি মাটিকে অনেক বেশি উর্বর করে তোলে। বৃষ্টির পানি মাটির নিচে জমা হয়। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক থাকে, যা পরে সেচকাজে লাগে। আউশ ও আমন ধান চাষের প্রধান উৎস হলো বর্ষার পানি।অতিরিক্ত সেচের খরচ ছাড়াই প্রকৃতি থেকে পানি পাওয়া যায়।করলা, ঝিঙে, পটল ও শাকসবজির ভালো ফলন হয়।

বর্ষাকালে কিছু সমস্যা তৈরি হয়, পোকামাকড় ও ছত্রাকজনিত রোগের আক্রমণ বেড়ে যায়। বেশি বৃষ্টির কারণে বন্যা হলে ফসল ডুবে নষ্ট হয়ে যায়। ভারী বৃষ্টিতে পাহাড় বা উঁচু জায়গার উর্বর মাটি ধুয়ে চলে যায়। কিছু ক্ষতি হলেও বর্ষার পানি ছাড়া বাংলাদেশের কৃষি এক মুহূর্তও চলতে পারবে না।

আমাদের দেশের কৃষকদের জীবন ও জীবিকা বহুলাংশে বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে। বৃষ্টি যেমন তাদের মুখে হাসি ফোটায়, তেমনি অনাবৃষ্টি বা অতিবৃষ্টি তাদের জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হলে ফসলের খেত পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে পাকা ফসল নষ্ট হয়ে যায় এবং কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনি ও পুঁজি দুই-ই ভেস্তে যায়। ফসল নষ্ট হলে কৃষকরা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। কারণ তাদের সারা বছরের সংসার চালানো ও পরবর্তী চাষাবাদের খরচ এই ফসলের ওপরই নির্ভর করে।

বিজ্ঞানী ও গবেষকরা এমন কিছু ফসলের জাত আবিষ্কার করেছেন যা কম পানিতে বা অতিরিক্ত পানিতেও নষ্ট হয় না।প্রকৃতির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাতে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা কৃষকদের সাহায্য করছে। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষকরা এখন আগেই বৃষ্টির খবর পেয়ে যান এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারেন।

আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগলেও প্রকৃতির দান বৃষ্টির গুরুত্ব কৃষকদের জীবনে অপরিসীম। সঠিক সময়ে পরিমিত বৃষ্টিপাতই কৃষকের মুখে প্রকৃত হাসি ফোটাতে পারে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট