ম্যাচের চিত্রটা তখন প্রায় পরিষ্কার। পাকিস্তানের অষ্টম উইকেট পড়ে গেছে, ইনিংস হার এড়াতেই প্রয়োজন আরও ২ রান। ইংল্যান্ডের সামনে তখন অপেক্ষা করছিল দ্রুত জয়ের সম্ভাবনা। কিন্তু ২১ বছর বয়সী অভিষিক্ত পেসার রাজাউল্লাহ ও মোহাম্মাদ আব্বাসের ব্যাটে পাল্টে গেল পুরো দৃশ্যপট। নবম উইকেটে ১২১ রানের জুটি গড়ে পাকিস্তানকে শুধু ইনিংস হার থেকে বাঁচাননি তারা, ইংল্যান্ডের সামনে চতুর্থ ইনিংসে জয়ের জন্য ১৩০ রানের লক্ষ্যও ছুড়ে দিয়েছেন।
বাংলাদেশ সময় শনিবার সকালে এজবাস্টন টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলা শেষ হয়। দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৪৯ রানে অলআউট হয়েছে পাকিস্তান। এর মধ্যে রাজাউল্লাহর অবদান ৬৩ বলে ৮১ রান। চারটি চারের সঙ্গে তিনি মেরেছেন ৯টি ছক্কা। টেস্ট অভিষেকে সবচেয়ে বেশি ছক্কার রেকর্ডে নিউজিল্যান্ডের টিম সাউদির পাশে বসেছেন তিনি।
প্রথম দুই টেস্টে বড় ব্যবধানে হারের পর পাকিস্তান দলে বেশ কিছু পরিবর্তন আনে। সাত ক্রিকেটারকে দেশে পাঠিয়ে নতুন করে সাতজনকে ইংল্যান্ডে উড়িয়ে নেওয়া হয়। তাদের একজন রাজাউল্লাহ। মাত্র আটটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচের অভিজ্ঞতা নিয়ে টেস্ট অভিষেকে নামা এই পেসারই শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের ত্রাতা হয়ে উঠলেন।
তৃতীয় দিন শুরুতেই পাকিস্তানের সামনে ছিল ইনিংস হারের শঙ্কা। দ্বিতীয় ইনিংসে ৫২ রানে ২ উইকেট নিয়ে দিন শুরু করা দলকে লড়াইয়ে ফেরান আজান আওয়াইস, শান মাসুদ ও বাবর আজম। আজান ৫৯, মাসুদ ৯৫ এবং বাবর করেন ৭৬ রান।
আজান ও মাসুদের জুটিতে আসে ১২৫ রান। ৮৪ বলে ৫৯ রান করে ড্যান লরেন্সের বলে কট বিহাইন্ড হন আজান। এরপর মাসুদের সঙ্গে ৮৯ রানের জুটি গড়েন বাবর। সেঞ্চুরির পথে থাকা মাসুদ শেষ পর্যন্ত গাস অ্যাটকিনসনের বলে গালিতে ড্যান লরেন্সের দুর্দান্ত এক হাতে নেওয়া ক্যাচে ফেরেন, ৫ রান দূরে থেকে থামেন সেঞ্চুরি থেকে।
১২ চারে ১৪৮ বলে ৯৫ রান করেন পাকিস্তান অধিনায়ক। অন্যদিকে বাবর আজমও ভালো শুরু পেয়েছিলেন। ৭৬ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন তিনি এবং দেশের পঞ্চম অধিনায়ক হিসেবে টেস্টে ২ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। তবে সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়েও জশ টাংয়ের বলে কিপার জর্ডান কক্সের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন বাবর।
এ নিয়ে টেস্টে বাবরের সেঞ্চুরি-খরা টানা ৪০ ইনিংসে পৌঁছেছে। সবশেষ তিন অঙ্কের ইনিংস তিনি খেলেছিলেন ২০২২ সালের ডিসেম্বরে, করাচিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে।
এরপর দ্রুত উইকেট হারিয়ে পাকিস্তান যখন ৩১৮ রানে ৮ উইকেটে পরিণত হয়, তখন ম্যাচ শেষ হওয়ার অপেক্ষাই করছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু রাজাউল্লাহ ক্রিজে আসার পর বদলে যায় সব হিসাব।
ইনিংসের শুরুতেই জশ টাংকে ছক্কা মেরে পাকিস্তানকে ইনিংস হার থেকে বাঁচান রাজাউল্লাহ। এরপর অ্যাটকিনসনের এক ওভারে তিনটি ছক্কা হাঁকান তিনি। মোহাম্মাদ আব্বাসও পাল্টা আক্রমণে যোগ দেন। দুই টেলএন্ডারের ব্যাটে রান বাড়তে থাকে দ্রুত।
রাজাউল্লাহ মাত্র ৪৩ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন। টেস্ট অভিষেকে পাকিস্তানের হয়ে এটি দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড। অন্যদিকে আব্বাসও তুলে নেন টেস্ট ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ৪২ রান। ৬৭ বলে তার ইনিংসে ছিল পাঁচটি চার ও দুটি ছক্কা।
নবম উইকেটে রাজাউল্লাহ ও আব্বাসের ১২১ রানের জুটি পাকিস্তানকে ৪০০ রানের কাছাকাছি নিয়ে যায়। আব্বাস আউট হওয়ার সময় দলের রান ছিল ৪৩৯, লিড ১১৯। দুই ব্যাটারের জুটিতে আসে ১০টি ছক্কা, টেস্টের ১৪৯ বছরের ইতিহাসে কোনো দলের শেষ তিন ব্যাটসম্যানের জুটিতে এত ছক্কা দেখা যায়নি।
আব্বাস ফেরার পরও থামেননি রাজাউল্লাহ। ড্যান লরেন্সকে ছক্কা মেরে টেস্ট অভিষেকে ৯ ছক্কার রেকর্ড স্পর্শ করেন তিনি। ২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ডের হয়ে অভিষেকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৯ ছক্কা মেরেছিলেন টিম সাউদি। ১৮ বছর পর সেই রেকর্ডে ভাগ বসালেন রাজাউল্লাহ।
শেষ পর্যন্ত লরেন্সের বলে উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে এসে স্টাম্পড হন রাজাউল্লাহ। তার ৬৩ বলে ৮১ রানের ইনিংসে ছিল চারটি চার ও নয়টি ছক্কা। সেঞ্চুরি থেকে ১৯ রান দূরে থামলেও তার ইনিংসেই ম্যাচের গতিপথ বদলে যায়।
এর আগে ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে ৪৫৩ রানের জবাবে পাকিস্তান প্রথম ইনিংসে করেছিল মাত্র ১৩৩ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৪৯ রান করায় ইংল্যান্ডের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৩০ রান।
প্রথম দুই ম্যাচে হেরে সিরিজে পিছিয়ে থাকা পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করতে চতুর্থ দিনে এই রান তাড়ায় নামবে ইংল্যান্ড। ম্যাচটি তৃতীয় দিনেই শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও রাজাউল্লাহর বিস্ফোরক ব্যাটিং সেটিকে টেনে নিয়ে গেল চতুর্থ দিনে।