গ্রাফটিং টমেটোর চারা বদলে দিচ্ছে কমলগঞ্জের কৃষি অর্থনীতি

এফএনএস (আতাউর রহমান কাজল; শ্রীমঙ্গল, মৌলভী বাজার) : | প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:৪২ পিএম
গ্রাফটিং টমেটোর চারা বদলে দিচ্ছে কমলগঞ্জের কৃষি অর্থনীতি

একদিকে নার্সারিতে সারি সারি সবুজ চারা, অন্যদিকে হাতে ব্লেড নিয়ে ব্যস্ত শ্রমিক। নিখুঁতভাবে একটি চারার গোড়ার অংশের সঙ্গে আরেকটি চারার ওপরের অংশ জুড়ে দিচ্ছেন তারা। কয়েক দিনের পরিচর্যায় তৈরি হচ্ছে শক্তিশালী গ্রাফটিং টমেটোর চারা। কমলগঞ্জে এখন শুধু টমেটো চাষ নয়, টমেটোর চারা উৎপাদনও হয়ে উঠেছে লাভজনক কৃষি উদ্যোগ।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন নার্সারিতে উৎপাদিত এসব গ্রাফটিং টমেটোর চারা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। দুর-দূরান্তের কৃষকেরাও এখন কমলগঞ্জের এসব চারার ওপর নির্ভর করছেন। উপজেলার আদমপুর, জালালপুর, বনগাঁও, কান্দিগাঁও, মধ্যগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে গ্রাফটিং টমেটোর চারার নার্সারি। মৌসুম এলেই এসব নার্সারিতে শুরু হয় কর্মচাঞ্চল্য। চারা উৎপাদন, গ্রাফটিং, পরিচর্যা, বাছাই ও বিক্রির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন উদ্যোক্তা ও শ্রমিকেরা।

নার্সারি উদ্যোক্তারা জানান, প্রথমে তিতবেগুন ও টমেটোর আলাদা বীজতলা তৈরি করা হয়। তিতবেগুনের চারা গ্রাফটিংয়ের উপযোগী হতে প্রায় ৩৫ দিন এবং টমেটোর চারা প্রায় ২৫ দিনে প্রস্তুত হয়। এরপর দুই ধরনের চারার মধ্য থেকে সবল ও স্বাস্থ্যবান চারা বাছাই করা হয়। বাছাই করা চারার কান্ডে বিশেষ কায়দায়  তিতবেগুনের নিচের অংশের সঙ্গে টমেটোর ওপরের অংশ জুড়ে দেওয়া হয়। পরে জোড়ার স্থানটি বিশেষ পলিথিন দিয়ে বাঁধা হয়। তিন থেকে ছয় দিনের মধ্যে দুটি অংশ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এরপর চারাগুলোকে আরও ১০ থেকে ১২ দিন বিশেষ পরিচর্যার ঘরে রাখা হয়। সবশেষে বিক্রির জন্য প্রস্তুত হয় গ্রাফটিং চারা।

কৃষকরা বলেন, গ্রাফটিং করা টমেটোর গাছ সাধারণত সহজে ঢলে পড়ে না এবং রোগবালাইও তুলনামূলক কম হয়। ফলে গাছ সবল থাকে এবং ফলনও বেশি পাওয়া যায়। তাদের ভাষ্য, সাধারণ একটি টমেটো গাছে যেখানে পাঁচ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়, সেখানে গ্রাফটিং করা একটি গাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ কেজি পর্যন্ত টমেটো পাওয়া সম্ভব।

ভারি বৃষ্টিতেও গাছ টিকে থাকে। গ্রাফটিং টমেটোর আরেকটি সুবিধা হলো পানি সহনীয়তা-এমনটাই দাবি করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। ভারি বৃষ্টির সময় সাধারণ টমেটো গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও গ্রাফটিং করা গাছ তুলনামূলক ভালোভাবে টিকে থাকে। এ কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকের মধ্যে এ চারার চাহিদা বাড়ছে। শুধু মৌলভীবাজার নয়, দেশের আরও ৮ থেকে ১০টি জেলায় চারা সরবরাহ করা হচ্ছে। কৃষকরা বলেন, অনেক কৃষক মৌসুম শুরুর আগেই কতটি চারা প্রয়োজন তা জানিয়ে অর্ডার দেন। চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো চারা সরবরাহ করতে অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়। প্রতিটি গ্রাফটিং টমেটোর চারা বিক্রি হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে। চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ খাতে যুক্ত হচ্ছেন নতুন উদ্যোক্তারা। তৈরি হচ্ছে স্থানীয় কর্মসংস্থানও। একজন দক্ষ শ্রমিক দিনে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০টি পর্যন্ত চারা গ্রাফটিং করতে পারেন। ফলে মৌসুমজুড়ে এ কাজে শ্রমিকদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. রাকিবুল ইসলাম জানান, উপজেলায় প্রতি মৌসুমে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ গ্রাফটিং টমেটোর চারা উৎপাদন হচ্ছে। এসব চারা মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, গ্রাফটিং টমেটোর চারা উৎপাদন ও বিক্রিকে কেন্দ্র করে এক মৌসুমে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার লেনদেন হয়। এটি এখন উপজেলার কৃষি অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হয়ে উঠছে। কৃষি কর্মকর্তা জানান, চলতি মৌসুমে কমলগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ হয়েছে। এ চাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ৪৮০ জন কৃষক।  কৃষি বিভাগের সহায়তা, মানসম্মত বীজ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে কমলগঞ্জে গ্রাফটিং টমেটোর চারা উৎপাদন আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে কৃষকের উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে নার্সারি ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সন্ধীপ তালুকদার বলেন, ‘কমলগঞ্জের কৃষি অর্থনীতিতে টমেটো এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এখানকার গ্রাফটিং টমেটোর চারা দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত একটি কৃষিপণ্য ও চারা যখন দেশের নানা প্রান্তের কৃষকের চাহিদা পূরণ করছে, তখন এটি কমলগঞ্জের কৃষির নতুন সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দেয়। এ খাতকে আরও সম্প্রসারিত করা গেলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগও আরও সমৃদ্ধ হবে।’

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে