আমাদের দেশে ক্রমান্বয়ে নদী হারিয়ে যাচ্ছে। নদী হলো পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য সম্পদ আহরণ, যোগাযোগব্যবস্থা ও সেচের অন্যতম মাধ্যম। সমাজ-সভ্যতার ক্রমবিকাশে নদীর ভূমিকা অনেক। কিন্তু দিন দিন বিভিন্ন কারণে নদী দখল হয়ে যাচ্ছে। নদীতে বর্জ্য ফেলে যখন নদীকে দূষিত করা হয়, তখন বোঝা যায় আমরা জাতি হিসেবে কতটুকু নদীবান্ধব! বিভিন্ন সরকারের সময়ে নদ-নদী রক্ষার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়। তবে সেসব শুধু কাগজবন্দীই থেকে গেছে। কার্যকর কোনো পদক্ষেপের বাস্তবায়ন সেভাবে দেখা যায়নি। নদী বাঁচাতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল ২০১৩ সালে। এর পরের বছর উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠন করা হয় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (এনআরসিসি)। মূলত দেশের নদ-নদীর দখল-দূষণ রোধের পাশাপাশি স্বাভাবিক নাব্যতা বজায় রাখার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানটির থাকলেও তারা সেই অর্পিত দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ফলে অধিকাংশ নদ-নদী দখল-দূষণে আজ মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে কতগুলো পরিণত হয়েছে ভাগাড়ে, আর কতগুলো নদ-নদী যে বিলীন হয়ে গেছে, তার কোনো হিসাব নেই। দুঃখজনকভাবে সত্য যে, এ দেশের অসংখ্য নদীর অবস্থা বিষখালীর মতোই। দখল-দূষণের কারণে অনেক নদী যেমন অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে, তেমনি বর্জ্যরে কবলে পড়ে অনেক নদী তার জৌলুশ হারিয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন একটু উদ্যোগী হলে নদ-নদী এভাবে বিলীনের পথে অগ্রসর হতো না। নদী দূষণের সবচেয়ে বড় উৎস শিল্পকারখানা। রাজধানী ও আশপাশে নদীর পাড়ে প্রায় ৭ হাজার ছোট-বড় শিল্পকারখানা রয়েছে এবং এসব শিল্পের বিপুল অংশে কার্যকর তরল বর্জ্য শোধনাগার নেই। শিল্পবর্জ্যের আউটলেট অনেক ক্ষেত্রে স্যুয়ারেজ লাইনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। কেমিক্যাল শিল্প ও ট্যানারির বর্জ্য পানিকে দ্রুত বিষাক্ত করে তুলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে হাসপাতালের বর্জ্য, নৌযানের কালো তেল ও পোড়া মবিল, পলিথিন এবং নদী তীরবর্তী বাজারের পচা আবর্জনা। পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে নদীর সঙ্গে ঢাকার খালগুলোর স্বাভাবিক সংযোগ পুনঃস্থাপন করতে হবে। খাল দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা যেমন দুর্বল হয়েছে, তেমনি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। খাল পুনরুদ্ধার, নদীর প্রবাহ সচল রাখা এবং নদী তীরে বর্জ্য ফেলা বন্ধ- এই তিনটি কাজকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। আমরা মনে করি, নদী-খাল দখলমুক্ত ও দূষণ রোধে সরকারকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য মাঠ পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।