কুড়িগ্রামের রাজারহাটে জটিল ও ব্যয়বহুল রোগে আক্রান্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য সরকারের দেওয়া বিশেষ অনুদানের টাকা নিয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি তালিকায় নাম থাকলেও উপজেলার একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্ধারিত ১৫ হাজার টাকা করে অনুদান পাননি। তাঁদের অভিযোগ, তাঁদের নাম ও প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে অজ্ঞাত একটি চক্র অন্য নগদ নম্বরে টাকা গ্রহণ করে আত্মসাৎ করেছে।
এ ঘটনায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের মধ্যে। তাঁদের দাবি, তাঁরা নিজেরা অনুদানের জন্য আবেদনই করেননি। অথচ সরকারি তালিকায় তাঁদের নাম রয়েছে এবং তাঁদের নামে বরাদ্দ করা অর্থও বিতরণ করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও সরকারি তালিকা অনুযায়ী, রাজারহাট উপজেলার বুড়িরহাট আব্দুস সামাদ মন্ডল দাখিল মাদ্রাসার সুপার আসাদুজ্জামান খন্দকার, কানুরাম সিদ্দিকীয়া দাখিল মাদরাসার সুপার সাইফুল ইসলাম, পূর্ববালাকান্দি দাখিল মাদরাসার সুপার শাহিদুল ইসলাম, শরফউদ্দিন মহিলা দাখিল মাদরাসার সুপার নুরুজ্জামান এবং সুখদেব ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ নুরুল আমিন সরকার জটিল ও ব্যয়বহুল রোগে আক্রান্ত শিক্ষক-কর্মচারী হিসেবে বিশেষ অনুদানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
প্রত্যেকের জন্য ১৫ হাজার টাকা করে বিশেষ অনুদান নির্ধারণ করা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের দাবি, তাঁদের কেউই ওই অর্থ পাননি। বরং তাঁদের অজ্ঞাতসারে অন্য মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
বুড়িরহাট আব্দুস সামাদ মন্ডল দাখিল মাদ্রাসার সুপার আসাদুজ্জামান খন্দকার বলেন, “আমি বিশেষ অনুদান প্রাপ্তির জন্য কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের কোথাও আবেদন করিনি। কে বা কারা আমার নাম ও প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছে।”
কানুরাম সিদ্দিকীয়া দাখিল মাদরাসার সুপার সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমি কিছুই জানি না। একটি টেলিভিশনের সংবাদে বিষয়টি জানতে পেরে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট দেখে নিশ্চিত হই, আমার প্রতিষ্ঠান ও নাম ব্যবহার করে একটি প্রতারক চক্র ১৫ হাজার টাকা নগদ নম্বরের মাধ্যমে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “শুধু আমার না, এ রকম কুড়িগ্রামের ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানের নাম তালিকাভুক্ত করে ওই প্রতারক চক্র বিশেষ অনুদানের টাকা তুলে আত্মসাৎ করেছে।”
প্রজ্ঞাপনে জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের রাজস্ব বাজেট শাখা থেকে জারি করা স্বারক নং-৫৭,০০,০০০০,০৪৪.০২.০২৮,১৮(অংশ)-৩০২; তারিখ ৩ আগস্ট ২০২৬-এর আদেশে বলা হয়েছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের সংশোধিত পরিচালন বাজেটে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীন ‘১৬০০১০১-১২০০০১৫১৪- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক এবং ছাত্রবৃন্দের জন্য বিশেষ অনুদান’এর ৩৬৩১১০৭-বিশেষ অনুদান খাতে মোট ৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
বরাদ্দের মধ্যে-৪২৮টি মনোনীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ২৫ হাজার টাকা করে মোট ১ কোটি ৭ লাখ টাকা, ৮৫৩ জন মনোনীত শিক্ষক-কর্মচারীকে ১৫ হাজার টাকা করে মোট ১ কোটি ২৭ লাখ ১৫ হাজার টাকা, ২ হাজার ৪৮৪ জন ইবতেদায়ী (১ম থেকে ৫ম) শ্রেণির শিক্ষার্থীকে ৫ হাজার টাকা করে মোট ১ কোটি ২৪ লাখ ২০ হাজার টাকা ,৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি (দাখিল ও ভোকেশনাল) পর্যন্ত ৩ হাজার ১৬৭ জন শিক্ষার্থীকে ৮ হাজার টাকা করে মোট ২ কোটি ৫৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা, এইচএসসি (বিএম), আলিম ও ডিপ্লোমা পর্যায়ের ১ হাজার ১২৮ জন শিক্ষার্থীকে ১০ হাজার টাকা করে মোট ১ কোটি ১২ লাখ ৮০ হাজার টাকা ও কামিল, ফাজিলসহ তদূর্ধ্ব শ্রেণির ৫৩৭ জন শিক্ষার্থীকে ১০ হাজার টাকা করে মোট ৫৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এসব টাকা সাত কর্মদিবসের মধ্যে বিতরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন মন্ত্রণালয়। অপর আদেশে বলা হয়েছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘বাংলাদেশ ডাক বিভাগ-নগদ-এর মাধ্যমে মনোনীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত হারে অর্থ বিতরণ করতে হবে এবং আদেশ জারির ৭ (সাত) কর্মদিবসের মধ্যে অর্থ বিতরণ সম্পন্ন করে বিতরণের বিস্তারিত প্রতিবেদন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে দাখিল করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে এ অর্থ বিতরণ প্রক্রিয়াতেই অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন রাজারহাটসহ জেলার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা। তাঁদের দাবি, সরকারি তালিকায় তাঁদের নাম থাকলেও তাঁদের ব্যবহৃত বা তাঁদের দেওয়া নগদ নম্বরে টাকা না গিয়ে অন্য নম্বরে অর্থ চলে গেছে।
অথচ এক নম্বরে একাধিক অনুদান নয় বিশেষ অনুদানের অর্থ বিতরণে মন্ত্রণালয়ের এমন কঠোর শর্ত দিয়ে আদেশ দেওয়া হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক-কর্মচারী বা শিক্ষার্থীর অনুকূলে প্রদেয় অনুদানের অর্থ একটি ব্যাংক হিসাব/মোবাইল নম্বরে শুধুমাত্র একবার প্রেরণ করা যাবে। কোনো ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল নম্বরে একাধিক অনুদানের অর্থ প্রেরণ করা যাবে না। আদেশে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বরাদ্দকৃত অর্থ মনোনীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব নম্বরে প্রদান করতে হবে। এ ছাড়া অব্যয়িত অর্থ ১০ কর্মদিবসের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার এবং তার প্রমাণক সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, মন্ত্রণালয়ের আদেশে একদিকে নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ বরাদ্দ এবং বিতরণের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্টদের দাবি-তাঁদের নাম ব্যবহার করেই অন্য নম্বরে টাকা পাঠানো হয়েছে।
ফলে তাদের প্রশ্ন , সরকারি তালিকায় প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের নাম কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো, তাঁদের অজ্ঞাতসারে মোবাইল নম্বর কে বা কারা সরবরাহ করল, কোন নম্বরে টাকা পাঠানো হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত কারা সেই টাকা উত্তোলন করেছে?
মঙ্গলবার(১৫সেপ্টেম্বর) সকালে এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, “বিষয়টি আমি শুনেছি। কয়েকজন প্রতিষ্ঠানপ্রধানের নাম বিশেষ অনুদানের জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে। তবে তাঁরা নিজেরাই আবেদন করেছেন এবং এ ক্ষেত্রে আমার সুপারিশের প্রয়োজন ছিল না। তাঁরা অনুদানের টাকা পেয়েছেন কি না, সে বিষয়ে আমি অবগত নই।”
তিনি বলেন, “তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা যদি অনুদানের জন্য আবেদন না করে থাকেন এবং তাঁদের অজ্ঞাতসারে অন্য কোনো নগদ নম্বরে টাকা পাঠিয়ে তা উত্তোলন করা হয়ে থাকে, তাহলে তাঁরা বিষয়টি আইনগতভাবে তদন্তের জন্য থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে পারেন।“
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আরও বলেন, “বিষয়টি নিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানদেরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”