শেরপুরের হতদরিদ্র অসুস্থ বৃদ্ধ দম্পতি সাজু শেখ ও নুরজাহানের পাশে দাড়িয়েছেন জেলা প্রশাসন সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। দীর্ঘদিন ধরে ওই দম্পতি শারীরিক অক্ষমতা ও বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করে আসছিলেন। গত সোমবার দুপুরে শেরপুর জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন ওই দম্পতির চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে তাদের শহরের আবেদীন হাসপাতালে ভর্তি করান এবং হাসপাতালে অসুস্থ বৃদ্ধার চিকিৎসার খোঁজ খবর নেন। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা হাসপাতালে ভর্তি ওই দম্পতিকে দেখতে যান এবং অসুস্থ বৃদ্ধার জন্য একটি হুইল চেয়ার উপহার দেন। একই সাথে তিনি বৃদ্ধ দম্পতির জন্য নতুন ঘর নির্মাণসহ খাদ্য সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেন। এরআগে শেরপুর সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. হযরত আলী ওই বৃদ্ধ দম্পতির বাড়িতে গিয়ে খাবার ও নগদ আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসেন। এদিকে ওই অসুস্থ বৃদ্ধ দম্পতির খোঁজখবর নিতে আবদীন হাসপাতালে যান শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদের প্রতিনিধি দল। এ সময় ইসলামী ছাত্রশিবির ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন । শেরপুরের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রক্ত সৈনিক বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকেও ওই বৃদ্ধ দম্পতিকে খাদ্যদ্রব্য সহায়তা দেওয়া হয়।
জানা যায়, শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামের ৮৬ বছর বয়সের বৃদ্ধ সাজু শেখ এবং ৮০ বছর বয়সের বৃদ্ধা নুরজাহান। প্রায় ৭০ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই তারা সাজু শেখের পৈতৃক ভিটায় বসবাস করলেও আর্থিক দৈন্যতায় কাঁচা মালের ব্যবসা করতেন। সীমিত আয়ের মধ্যেও সাজু শেখ ও নুরজাহানের ভালোবাসা কমতি ছিল না। তাদের তিন মেয়ে ও তিন ছেলে । তিন মেয়ের দীর্ঘদিন আগেই বিয়ে হয়েছে। ওই মেয়েদের কেউ কেউ কালে-ভদ্রে বাব-মার খোঁজ নেয়। আর তিন ছেলের মধ্যে একজন করোনার সময় নিরুদ্দেশ হলেও মাঝে মধ্যে খোঁজখবর রাখেন তাদের। আরেকজন ঢাকায় রিকশা চালান। তিনিও বছরে দু’একবার বাড়িতে আসেন। শেরপুরে বসবাসকারী অপর ছেলে নুর ইসলাম দিনমজুর ও ঠেলাগাড়ি চালিয়ে বৃদ্ধ মা বাবার সাধ্যমতো ভরণপোষণ ও খোঁজখবর রাখেন। কিন্তু এই দুর্মূল্যের বাজারে ছেলে নুর ইসলামের নিজের সংসার চলে টানাটানির মধ্যে। তারও স্ত্রী চিকিৎসার অভাবে কয়েক বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। প্রায় পাঁচ বছর আগে পা পিছলে গিয়ে পড়ে নুরজাহানের কোমরের হাড় ভেঙে যায়। তারপর থেকেই নুরজাহান বিছানায় শয্যাসয়ী। দৈন্যতার কারণে চিকিৎসা করাতে পারছে না স্বামী সাজু শেখ। ছেলে নুর ইসলামও মায়ের চিকিৎসার জন্য নিরুপায়। এমনই অবস্থায় সাজু শেখ তার স্ত্রীর প্রতি চরম ভালোবাসার কারণে অসুস্থ হওয়ার পরও অদ্যাবধি এক মুহূর্ত তাকে ছেড়ে কোথাও যাননি। শারীরিক অসুস্থতা ও বয়সের কারণে ইতোমধ্যে নুরজাহান প্রতিবন্ধী হয়ে গেছে। বয়সের ভারে সাজু শেখও সোজা হয়ে চলতে পারে না। বার্ধক্য তাকে করেছে বধির। জোরে জোরে কথা না বললে কারো কথা শুনতে পারে না সাজু শেখ। তবে স্ত্রীর ভালোবাসার প্রতি অঢেল টান থাকায় দিনরাত তার পাশে বসে থাকে সাজু শেখ। শয্যাসায়ী হওয়ার পর থেকেই প্রতিদিন সকালে সাজু শেখ স্ত্রীকে কোলে নিয়ে ঘরের দরজার বাইরে উঠোনে চটি বিছিয়ে শুইয়ে রাখেন এবং সাজু শেখ স্ত্রীর পাশে বসে তাকে সময় দেন । সাজু শেখ কানে কম শুনলেও স্ত্রীর ইশারাতে সবকিছু বুঝে নেয়। প্রস্রাব-পায়খানা থেকে শুরু করে সব কাজকর্ম কাঁপা কাঁপা হাতে ও ভাঙা শরীর নিয়ে সাজু শেখ স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টান্ত হয়ে সেবা করে যাচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানায়, সাজু শেখ অর্থের জন্য প্রায় মাঝেমধ্যে বাড়ির পাশে খুনুয়া বাজারে চলে আসেন কাজের সন্ধানে। কিন্তু কঙ্কালসার দেহ দেখে কাজ দেবে কে ? তাই বাজার ঘুরে পরক্ষণেই ফিরে আসেন স্ত্রীর কাছে। মাঝে মাঝে আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে ফরিয়াদ করেন, ‘আমাদের দুজনকে একসঙ্গে নিয়ে যাও আল্লাহ!’
গত ৯ সেপ্টেম্বর ঘরের দরজায় বাইরে দাঁড়িয়ে সাজু শেখ স্ত্রীকে কোলে নিয়ে এমনই এক কষ্টের আকুতি করেন। তিনি কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, ‘আল্লাহ আমাকে খাবার দাও, আমার স্ত্রীকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি।’ তাদের আর্তনাদ শুনে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর তাদের ভিডিও করে ফেসবুকে ছেড়ে দেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায়।