বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও শাকসবজির উর্ধ্বমুখী দামের ধাক্কায় সাধারণ মানুষ যখন দিশেহারা, তখনই দৈনন্দিন ব্যবহারের সাবান, টুথপেস্ট, ডিটারজেন্ট, শেভিং রেজার কিংবা নারিকেল তেলের মতো পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে নতুন বোঝা। ফলে খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি জীবনযাত্রার মৌলিক চাহিদাগুলোও এখন হুমকির মুখে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, করোনা-পরবর্তী কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং পরিবহণ ও বিদ্যুতের খরচ বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে-এ কথা অস্বীকার করা যায় না। তবে এই অজুহাতকে পুঁজি করে বাজারে যে অনৈতিক মুনাফাখোর সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তা স্পষ্টতই এক ধরনের নীতিহীন চক্র। আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য দাম বাড়লেই স্থানীয় খুচরা বাজারে তার বহুগুণ প্রভাব পড়ছে। ব্যবসায়ীদের অসংযত মুনাফালোভ এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রবণতা সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন আরও কোণঠাসা করে ফেলছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য সংসার চালানো এখন এক বিরাট সংগ্রাম। মাসের শুরুতেই বেতনের বড় অংশ নিঃশেষ হয়ে যায়। ফলে পুষ্টিকর খাবার বাদ পড়ছে, বিনোদন বাদ পড়ছে, আর মৌলিক চাহিদাগুলোতেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। জীবনযাত্রার এই অবনতি কোনো সুসংগঠিত সমাজ ও অর্থনীতির সুস্থতার লক্ষণ হতে পারে না। আমরা মনে করি, এ দুর্দশা থেকে নাগরিকদের রক্ষা করতে হলে মুক্তবাজার অর্থনীতির ভুল ব্যাখ্যা বন্ধ করা জরুরি। ‘মুক্তবাজার’ মানেই যে যার মতো দাম হাঁকিয়ে অন্যায্য লাভ করবে-এমনটা হতে পারে না। সরকারের উপযুক্ত তদারকি এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকর উপস্থিতির মাধ্যমেই কেবল বাজার তার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। এজন্য ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং অন্যান্য তদারকি সংস্থার দৃশ্যমান, কঠোর ও নিরবচ্ছিন্ন অভিযান থাকা প্রয়োজন। শুধু জরিমানা করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; অনিয়ম ও অন্যায্য মূল্য নির্ধারণের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদক থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পণ্যের প্রকৃত উৎপাদন খরচ এবং যৌক্তিক লাভ পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। সাধারণ মানুষের পকেটে আর কতটা চাপ সহ্য করার ক্ষমতা আছে, সেটা নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। সরকার যদি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তবে বাজারে স্বস্তি ফিরবে এবং সাধারণ মানুষের মুখে আবারও হাসি ফুটবে।