২০২২ সাল। হঠাৎ করেই সুন্দরবন যাওয়ার সুযোগ হয়ে গেল। কোনো দীর্ঘ পরিকল্পনা ছিল না। অনেকটা আকস্মিকভাবেই শুরু হয়েছিল আমার সুন্দরবনযাত্রা। সৈয়দপুর থেকে ট্রেনে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একসময় পৌঁছে গেলাম সুন্দরবনের কাছাকাছি এলাকায়। এরপর শুরু হলো প্রকৃতির সবচেয়ে বিস্ময়কর রাজ্যের দিকে আমার যাত্রা।
সুন্দরবনে যাওয়ার পথে পরিচয় হলো আমার সম বয়সী হাসিম নামে এক সাংবাদিকের সঙ্গে। প্রথম দেখাতেই পরিচয়, কথাবার্তা আর একসঙ্গে চা পান সবকিছুতেই মনে হলো, যেন এই মানুষটির সঙ্গে আমার অনেক দিনের পরিচয়। অল্প সময়ের মধ্যেই গড়ে উঠল আন্তরিকতা। তারপর তিনি আমাকে তার বাসায় নিয়ে গেলেন। সেখানে টানা দুই দিন থাকার সুযোগ হলো। তার বাড়িটি ছিল ছোট ছোট বন আর সবুজে ঘেরা এলাকায়। চারপাশে ছোট ছোট বন, আর সেই বনের মাঝখানে একটি করে বাড়ি। অদ্ভুত এক পরিবেশ। শহুরে জীবনের কোলাহল নেই, নেই যানবাহনের শব্দ; আছে শুধু প্রকৃতির নিজস্ব নীরবতা।
তবে রাত নামলে মনে প্রশ্ন জাগত এমন বনের মধ্যে যদি হঠাৎ বাঘ চলে আসে! ভয়ও লাগত। আবার সেই ভয়কে উপেক্ষা করেই সাহস করে থেকেছি। প্রকৃতির এত কাছে থাকার আনন্দের কাছে ভয়টাও যেন একসময় ছোট হয়ে গিয়েছিল।
সহকর্মী হাসিম এর বাসা থেকে সুন্দরবন প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। পরদিন তিনি মোটরসাইকেলে আমাকে নিয়ে গেলেন বনের দিকে। প্রথমে গেলাম সুন্দরবনের পশ্চিম পাশে। বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে চোখে পড়ল বড় বড় উঁচু-নিচু গর্ত। চারপাশে থইথই পানি। পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে ছোট-বড় নৌকা, স্পিডবোট ও লঞ্চ। সব মিলিয়ে এক অন্যরকম দৃশ্য। পশ্চিম পাশের সৌন্দর্য দেখার পর এবার গেলাম পূর্ব পাশে। সরাসরি বনের ভেতরে প্রবেশ না করে প্রথমে দাঁড়ালাম বাঁধের ওপর। সেখান থেকে চোখ মেলতেই দেখা গেল সারিবদ্ধ গাছপালা। মনে হচ্ছিল, কোনো দক্ষ মানুষ বুঝি পরিকল্পনা করে গাছগুলো সারিবদ্ধভাবে লাগিয়ে দিয়েছেন।
কিন্তু বাস্তবতা আরও বিস্ময়কর। এসব গাছ মানুষের হাতে সাজানো কোনো বাগান নয়। প্রকৃতি আপন নিয়মে, আপন শক্তিতে সৃষ্টি করেছে এই বিশাল সবুজ রাজ্য। বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সুন্দরবনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। গাছের সারি, পানির বিস্তৃতি আর নীরব সবুজের মেলবন্ধন মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। তবে বনের ভেতরের কোনো পশুপাখি তখন চোখে পড়েনি। বাঘ, হরিণ কিংবা অন্য কোনো বন্যপ্রাণীর দেখা না পেলেও মনে হচ্ছিল এই নীরবতার আড়ালেই হয়তো তারা রয়েছে।
এরপর নৌকা ভাড়া করে সুন্দরবনের ভেতরে প্রবেশের প্রস্তুতি। বনের প্রবেশমুখেই শুরু হলো সরকারি নিয়ম-কানুন। নির্দিষ্ট ফরমে স্বাক্ষর করতে হয়, এমনকি বন্ডেও সই করতে হয়। সেই বন্ডে মূলত জানিয়ে দেওয়া হয়, বনের ভেতরে গিয়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বন্যপ্রাণীর আক্রমণসহ তার দায়ভার বন কর্তৃপক্ষ নেবে না। এই নিয়ম শুনে মনের মধ্যে আবারও ভয় ঢ়ুকে গেল। কারণ সুন্দরবন কোনো সাধারণ বন নয়। এখানে বাঘ আছে, আছে নানা ধরনের বন্যপ্রাণী। জোয়ার-ভাটা, নদী-খাল, কাদামাটি আর ঘন জঙ্গলের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে থাকে এই বন। তারপরও মানুষ যায়। কেউ যায় জীবিকার প্রয়োজনে, কেউ গবেষণায়, কেউ প্রকৃতির টানে। আর কেউ যায় সুন্দরবনকে নিজের চোখে দেখার আকাঙ্ক্ষায়। আমিও সেই আকাঙ্ক্ষা নিয়েই প্রবেশ করেছিলাম সুন্দরবনের গভীরে। দূর থেকে হলেও যদি একটি বাঘ দেখা যায়! চোখের সামনে যদি কোনো হরিণ ছুটে যায়! কিংবা গাছের ডালে বসে থাকা কোনো অচেনা পাখি দেখা যায় এই প্রত্যাশা নিয়েই চলছিল আমাদের নৌযাত্রা।
সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি প্রকৃতির এক বিশাল বিস্ময়। পানি, কাদামাটি, নদী, খাল, গাছপালা আর বন্যপ্রাণীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক অনন্য জগৎ। এখানে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা মানুষের নেই। বরং মানুষকেই প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলতে হয়। ২০২২ সালের সেই আকস্মিক সুন্দরবনযাত্রা আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন।
সৈয়দপুর থেকে ট্রেনে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সেই সবুজের রাজ্যে পৌঁছানো, সহকর্মী হাসিম এর সঙ্গে পরিচয়, তার ছোট ছোট বনের ভেতরের বাড়িতে দুই দিন থাকা, মোটরসাইকেলে বাঁধের ওপর দিয়ে সুন্দরবনের দিকে ছুটে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত নৌকায় চড়ে বনের ভেতরে প্রবেশ সবকিছু আজও চোখের সামনে ভাসে। বাঘ দেখা হয়নি, হরিণও নয়। কিন্তু সুন্দরবন আমাকে দেখিয়েছে প্রকৃতির এক অন্যরকম রূপ। শিখিয়েছে প্রকৃতির সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখার বিষয় নয়, তাকে অনুভবও করতে হয়। সেই অনুভূতিই হয়তো সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।