বিপিসির এলপিজি আমদানির উদ্যোগে সরবরাহকারীদের সাড়া মিলছে না

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:১২ এএম
বিপিসির এলপিজি আমদানির উদ্যোগে সরবরাহকারীদের সাড়া মিলছে না

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) এলপিজি আমদানির উদ্যোগে গ্রহণযোগ্য সরবরাহকারীরা সাড়া দিচ্ছে না। ফলে দীর্ঘ ৭ মাসেও সংস্থাটি কোনো এলপিজি আমদানি করতে পারেনি। বরং ৫ বার দরপত্র আহ্বান করেও এলপিজি আমদানি করা যায়নি। ফলে বাধ্য হয়েই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি দরপত্রের বাইরে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ৫ হাজার টন এলপিজি কেনার উদ্যোগ নেয়। তবে কবে নাগাগ ওই গ্যাস সরবরাহ করা হবে বিপিসি এখনো তা নিশ্চিত হতে পারেনি। বিপিসি সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে গৃহস্থালির রান্নার কাজেই এলপিজি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়। মূলত আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগ বিগত ২০১৫ সাল থেকে বন্ধ থাকায় দিন দিন এলপিজির বাজার বড় হচ্ছে। এলপিজি খাতে বিগত ২০১৬ সালে আগের বছরের তুলনায় ১০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিলো। আর ২০১৭ সালে তা বেড়ে ১২৩ শতাংশে দাঁড়ায়। বিগত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে সাড়ে ৫ লাখ টন এলপিজি সরবরাহ হয়েছিল। বর্তমানে তা বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টনে পৌঁছেছে। কিন্তু এলপিজি ব্যবসার প্রায় পুরোটাই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে চলছে। বিগত ২০২০ সালে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ছিল প্রায় ৯০০ টাকা। আর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ২০২১ সালের মে মাস থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে। ওই বছরের মে মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ৮৪২ টাকা। কিন্তু ২০২২ সালে বিশ্ববাজারের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বাড়তে থাকে দাম। আর গত ডিসেম্বরের তীব্র সংকটে দেশের কোনো কোনো এলাকায় একটি সিলিন্ডার বিক্রি হয় তিন হাজার টাকায়ও। এমন পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে সঙ্কট উত্তরণে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং বাজারে সরবরাহ বাড়াতে বিপিসি গত জানুয়ারিতে সরকারিভাবে এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেয়। আর ওই মাসেই ৩ শর্তে বিপিসিকে এলপিজি আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। 

সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের এলপিজির বাজার প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি খাতনির্ভর হওয়ায় বাজারে সরকারের কার্যকর উপস্থিতি বাড়াতেই বিপিসি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ তাতে সরবরাহের একটি বিকল্প উৎস তৈরি হবে। কিন্তু ৭ মাস ধরে বারবার দরপত্র আহ্বান করেও বিপিসি এলপিজি আমদানির জন্য গ্রহণযোগ্য সরবরাহকারী পায়নি। সেজন্যই একটি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে প্রায় ৪৫ কোটি টাকার এলপিজি সরবরাহের অনুমতি দিয়েছে। তবে তা কবে নাগাদ দেশে আসবে তা কেউ নিশ্চিত নয়। বর্তমানে দেশের এলপিজির বাজারে মাত্র ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ সরকারের অংশ। বাকিটা বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু বিপিসি এলপিজি আমদানি করতে না পারায় বাজারে কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না। যদিও ইতিপূর্বে  সরকার কোনো এলপিজি আমদানি করেনি। দেশে শুধুমাত্র সরকারি তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারিতে তেল পরিশোধনের সময় উপজাত হিসেবে কিছু এলপিজি পাওয়া যায়। আর বেসরকারি খাতে ১৫ থেকে ২০টি প্রতিষ্ঠান এলপিজির বড় অংশ আমদানি করে।

সূত্র আরো জানায়, সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিগত চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৩ শর্তে বিপিসিকে এলপিজি আমদানির অনুমোদন দেয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ দফায় সরবরাহকারী খোঁজা হলেও কোনো প্রতিষ্ঠানই আগ্রহ দেখায়নি। পরে আগস্টে একটি প্রতিষ্ঠান এলপিজি সরবরাহের আগ্রহ প্রকাশ করলে বিপিসি সরাসরি ক্রয়ের উদ্যোগ নেয়। এলপিজির আগ্রহী সরবরাহকারী পাওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মূল্য বা প্রিমিয়াম ছিলো বড় বাধা। একটি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর চুক্তিমূল্যের সঙ্গে প্রতি টনে ২৭০ মার্কিন ডলার প্রিমিয়াম চেয়েছিল। কিন্তু বিপিসি ওই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। তবে অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটি সৌদি আরামকোর আগস্টের চুক্তিমূল্যের সঙ্গে প্রতি টনে ৯৭ ডলার প্রিমিয়ামে এলপিজি সরবরাহের প্রস্তাব দিলে বিপিসির মূল্যায়ন কমিটি ওই দরে পাঁচ হাজার টন এলপিজি কেনার সুপারিশ করে। তাতে মোট ৩৬ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার বা প্রায় ৪৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়। 

এদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলমের মতে, বিপিসির উদ্যোগে এলপিজি আমদানি প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা উচিত। আর শুধু একবার এলপিজি আমদানি করলেই বাজারে সরকারের কার্যকর উপস্থিতি তৈরি হবে না। সেজন্য বিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেডের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত এলপিজি আমদানির ব্যবস্থা করা জরুরি। তাছাড়া গড়ে তুলতে হবে নিজস্ব আমদানি, সংরক্ষণ ও বোতলজাত করার অবকাঠামো। বর্তমানে দেশের এলপিজির বাজার প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি খাতনির্ভর হওয়ায় বাজারে সরকারের কার্যকর উপস্থিতি বাড়ানো জরুরি। সেক্ষেত্রে বিপিসি আমদানি করলে সরবরাহের একটি বিকল্প উৎস তৈরি হবে এবং প্রতিযোগিতা বাড়বে।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. মনজুর আলম প্রধান জানান, এলপিজি আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। শিগগিরই আমদানি শুরু হবে। আর চট্টগ্রাম ও মোংলায় এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপনের চেষ্টা  হচ্ছে। ওসব প্ল্যান্ট তৈরি করা গেলে বিপিসির এলপিজিতে সক্ষমতা তৈরি হবে। তাতে উপকৃত হবেন ভোক্তারাও।