বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশ ছুঁলে ছত্রিশ ঘা। আর সাংবাদিক ছুঁলে গুনে শেষ করা যায় না। কথাটা হাসির ছলে বলা হলেও, এতে স্পষ্ট এই পেশাটা মানুষের চোখে আসলে কী? সমাজের একটা বড় অংশ মনে করে সাংবাদিকরা রাজনীতিবিদ আর ব্যবসায়ীদের পোষ্য। পকেটে কাড়ি কাড়ি টাকা। বাস্তবতাটা আসলে কী? বাস্তবতা হলো, ঢাকাসহ বড় যে কোন শহরে অনেক সাংবাদিক এই পরিচয় দিয়ে বাসা ভাড়া পাচ্ছেন না। বাড়িওয়ালা ভাবেন এরা সময়মতো ভাড়া দিতে পারবে না।
অবিবাহিত সহকর্মীরা আক্ষেপ করেন, তাদের পাত্র কিংবা পাত্রী হিসেবে কেউ পছন্দ করেন না। কারণ আজ চাকরি আছে তো কাল চাকরি নেই। করুণা আর অবিশ্বাস মিলিয়ে যে পেশাটা নিয়ে সমাজের মনোভাব এমন নেতিবাচক, সেই পেশাতেই প্রতিবছর আসছেন হাজার হাজার তরুণ তরুণী। কারণ তারা সেই মানুষদের কণ্ঠ হতে চান যাদের সমাজ ঘৃণা করে, করুণা করে।
সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে দীর্ঘদিন কাজ করে আসা বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আহমেদ আবু জাফর জানিয়েছেন, এই পেশায় লাশ পড়াটা যেন বাংলাদেশে এক নিয়মে পরিণত হয়েছে। কেউ প্রকাশ্যে খুন হচ্ছেন, কারো লাশ ভাসছে নদীতে, কেউ নিখোঁজ হয়ে ফেরেন মৃত অবস্থায়। কেউ চাঁপে পরে নিজের জীবনই শেষ করে দিচ্ছেন।
সবশেষ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন দৈনিক সমকাল পত্রিকার বরিশালের সাবেক ব্যুরো প্রধান পুলক চ্যাটার্জির নাম। যিনি আত্মহত্যার নোটে স্পষ্ট লিখে গেছেন আর্থিক অনিশ্চয়তা আর শারীরিক কষ্টের কথা। এই মৃত্যুকে নিছক ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি বলে সরিয়ে রাখলে গণমাধ্যমের গভীর কাঠামোগত অনেকটাই চাঁপা পরে যাবে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের হিসেবে জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী আঠারো মাসে অন্তত আট শত চৌদ্দ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। যাদের মধ্যে পাঁচ শত পঁচাশি জন সরাসরি হামলার শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে এক শত চুয়াত্তর জনকে হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি গত বিশ মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এক হাজার চৌত্রিশ জন সাংবাদিক।
আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই হাজার পাঁচ সালে বিশ্বজুড়ে এক শত আঠাশ জন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যাটা অনেক বেশি। এই সংখ্যাগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের দেশের পুলক চ্যাটার্জি, বিভুরঞ্জন সরকার, সোহানা পারভিন তুলি, শবনম শারমিন, রাহনুমা ছাড়া ওহেদুজ্জামান, বুলুর মতো নামগুলো। যাদের মৃত্যুর কারণ আলাদা। কিন্তু প্রশ্নটা এই চাকরি, বেতন, সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে এই মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক ছিল কিনা তা আজো অনুসন্ধান হয়নি।
বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আহমেদ আবু জাফরের মতে, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা নিয়ে আলোচনা মানেই তো স্বাধীনতা। হামলা হলে প্রতিবাদ, মামলা হলে উদ্বেগ, সেন্সরশিপ উঠলে সেমিনার। কিন্তু সাংবাদিকের শ্রমের দাম, চাকরির নিশ্চয়তা, কর্মহীন হলে সামাজিক নিরাপত্তা এসব নিয়ে কেউ কথা বলে না।
অথচ যে সাংবাদিক জানেন একটা প্রতিবেদনের কারণে চাকরি চলে যেতে পারে, সে কতটা স্বাধীন। মাসের পর মাস বেতন না পাওয়া মানুষের কাছে স্বাধীনতার দাম কতটুকু? নিয়োগপত্র নেই, প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। চাকরি হারালে বকেয়া বেতন আদায়ের নিশ্চয়তা নেই। অথচ তাকেই বলা হয় সত্যের পক্ষে দাঁড়াও, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করো, ঝুঁকি নাও। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে অর্থাৎ পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত মানুষের কাছে নির্ভীক সাংবাদিকতা প্রত্যাশা করাটাই তো আসলে এক ধরনের সারকাজম।
মফস্বলের সাংবাদিকদের অবস্থা আরও করুণ। স্বল্প বেতনে কোনোরকমে চাকরি করা, এই মানুষগুলোর একটু বয়স ও বেতন বেশি হলেই সংবাদপত্রগুলো আগের কর্মীদের যে কোনো ছুতোয় ছাঁটাই করছেন। সংবাদকর্মীদের বাধ্য করছেন বিজ্ঞাপন সংগ্রহে। সঙ্গে মালিকের এজেন্ডা বাস্তবায়ন তো রয়েছেই। এছাড়াও নানামুখী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক চাঁপও রয়েছে। সম্প্রতি সময়ে এগুলোর সাথে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের ট্যাগ।
সবকিছু মিলিয়ে মফস্বলের সাংবাদিকরা এক ভীতিকর পরিস্থিতির মুখে। অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের অবস্থা আরো করুন। বয়স বাড়ে, পারিশ্রমিকের প্রত্যাশা বাড়ে। কিন্তু স্থায়ী চাকরি বাড়ে না। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে চাকরি হারানো একজন মানুষ তরুণের মতো নতুন করে কাজ শুরু করতে পারেন না।
আহমেদ আবু জাফর বলেন, বর্তমান সময়ের এই পুরো সংকটের পেছনে একমাত্র দায় গণমাধ্যমের মালিকানা। অনেক প্রতিষ্ঠান সরাসরি ব্যবসায়িক রাজনৈতিক স্বার্থের সাথে জড়িত। ফলে ক্ষমতাবান কেউ প্রশ্ন করলে চাকরি হারানোর ভয়ে স্বাধীনতা থেকে যায় শুধুই কাগজে। আর এই জায়গাটিতে রাষ্ট্রও নীরব। নিরাপত্তা দেয়া, হামলার তদন্ত করা, খুনিকে বিচারের মুখোমুখি করা তারই দায়িত্ব। কিন্তু সে থাকে চুপচাপ। যার বাস্তব প্রমান বিশ্বব্যাপী আলোচিত সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনি হত্যা মামলাটি। তার মানে সাংবাদিককে শুধু অস্ত্র দিয়েই হত্যা করা যায় না। বেতন আটকে রেখে, চাকরির ভয় দেখিয়ে, প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা দিয়েও একটা পেশাকে প্রতিদিন একটু একটু করে মেরে ফেলা হচ্ছে।
যেকারণে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম দীর্ঘ বছর থেকে সাংবাদিকদের পেশাগত স্বীকৃতি, আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকা, শ্রম আইনের হুবহু অনুকরণসহ চৌদ্দ দফা উল্লেখ করে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে দাবি তুলে ধরে আসছেন। কিন্তু তা বাস্তবায়নে আগ্রহ নেই কারো।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ আবু জাফর বলেন, সংবাদপত্রের মালিকদের বুঝতে হবে সাংবাদিকতা সস্তা শ্রমিক নয়। তাদের শ্রমের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে মালিকদের ব্যবসা। আহমেদ আবু জাফর বলেছেন, অনেকেই প্রশ্ন করেন-সাংবাদিকদের মধ্যে ইউনিটি নেই। তারা দলীয় আচরণ করছেন।
তিনি বলেন, সাংবাদিকতা বোধহয় দেশে এমন এক পেশা এখন যেখানে দলীয়ভাবে বিভক্তি প্রকট হচ্ছে দিনে দিনে। সেই বিভক্তি বিদ্বেষ একেক সময় একেক রূপ নিচ্ছে। এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে ট্র্যাকিং করে ক্ষমতার সুবিধা নিচ্ছেন। নিজেরা দলীয় সুবিধা নিলেও যখন অন্যরা সুবিধা নেয়, তখন তাকে ট্যাগ দিয়ে অভিযুক্ত করা হয়।
বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের স্বপ্নদ্রষ্টা আহমেদ আবু জাফর বলেছেন-হামলা, মামলা, নিপীড়ন, অবহেলা, যোগ্য সাংবাদিককে একবার হত্যা করা যায়? কিন্তু সাংবাদিকতাকে প্রতিদিন একটু একটু করে হত্যা করা হচ্ছে। ভয় দেখিয়ে, বেতন আটকে, মর্যাদা কেড়ে নিয়ে আমাদের সংকটকে শুধু লাশের সংখ্যায় মাপা যাবে না। মাপতে হবে কতজন চুপ হয়ে গেছেন, কতজন পেশা ছেড়েছেন আর কতজন তরুণ স্বপ্ন হারিয়েছেন।
চাকরির নিরাপত্তা দিতে দেশব্যাপী কর্মরত পেশাদার সাংবাদিকদের মধ্যে যাদের বয়স কমপক্ষে পয়তাল্লিশ এবং সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা নূন্যতম দশ বছর, তাদের কোন শর্ত ছাড়াই চাকরির নিরাপত্তা দেয়ার জন্য রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলোর মালিকদের কাছে আহমেদ আবু জাফর জোর দাবি করেছেন।