সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় একাধিক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কোনো পেনশনার মারা গেলে তার স্বামী বা স্ত্রী এখন থেকে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন পাবেন। এত দিন এই সুবিধা ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত সীমিত ছিল। একই সঙ্গে সার্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক বা ইসলামিক স্কিম চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করার বিষয়ে আলোচনা হলেও এ নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে আপাতত ৬০ বছর বয়সেই পেনশন পাওয়ার নিয়ম বহাল থাকছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সার্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান। সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
পেনশনারের স্বামী বা স্ত্রী পাবেন ৮০ বছর পর্যন্ত
পেনশনারের মৃত্যুর পর তার স্পাউসের পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা পাঁচ বছর বাড়ানো হয়েছে। আগে ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত এই সুবিধা পাওয়া যেত। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন তা ৮০ বছর পর্যন্ত দেওয়া হবে।
ড. মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, পেনশনার আজীবন পেনশন পাবেন। তার মৃত্যুর পর স্পাউস ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন পাবেন। সাধারণত স্ত্রী বা স্বামীকে স্পাউস হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
অনুমোদন পেল শরিয়াহভিত্তিক স্কিম
সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় শরিয়াহভিত্তিক স্কিম চালুর অনুমোদন দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমে প্রচলিত স্কিমের পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতিতেও পেনশনের সুযোগ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হবে।
নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, সার্বজনীন পেনশন স্কিমের ইসলামিক ভার্সন অনুমোদন হয়েছে। তবে এটি চালুর আগে এর কাঠামো ও পরিচালনপদ্ধতি চূড়ান্ত করতে হবে। এ নিয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্থানীয় পরামর্শকেরা কাজ করছেন। একচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণসহ প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করার পর বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।
৫৫ বছরে পেনশনের সিদ্ধান্ত হয়নি
পেনশন শুরুর বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করার বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই আপাতত ৬০ বছর বয়সে পেনশন পাওয়ার নিয়মই থাকছে।
ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, ৫৫ বছর বয়সে পেনশন দেওয়ার বিষয়টি আপাতত সিদ্ধান্ত হয়নি। একচুয়ারিয়াল সায়েন্সে নিয়োগ পাওয়া বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী গভর্নিং বডির সভায় বিষয়টি আবার উপস্থাপন করা হতে পারে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে পেনশন শুরুর বয়স ৬২, ৬৬ বা ৬৭ বছর। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ুও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
বিনিয়োগে ১১.৭২ শতাংশের বেশি মুনাফা
সার্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষের তহবিল বিনিয়োগ করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশের বেশি মুনাফা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের সভায় এই মুনাফা অনুমোদন করা হয়েছে।
তবে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশনভোগীদের মুনাফা দেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তহবিলের পরিধি আরও বাড়লে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান নির্বাহী চেয়ারম্যান।
নতুন সদস্য নিবন্ধনে প্রণোদনা বাড়ল
সার্বজনীন পেনশনে আরও বেশি মানুষকে যুক্ত করতে নিবন্ধনের প্রণোদনা বাড়ানো হয়েছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি), মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান একজন নতুন সদস্য নিবন্ধন করালে এখন ২৫ টাকা পাবে। আগে এই প্রণোদনা ছিল ১৫ টাকা।
ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, প্রণোদনা বাড়ানো হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি মানুষকে সার্বজনীন পেনশনের আওতায় আনার চেষ্টা করবে।
সরকারি কোম্পানির কর্মীরা আসবেন ‘প্রগতি’তে
ডাক বিভাগ ছাড়া যেসব সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির কর্মীরা বর্তমানে কোনো পেনশন স্কিমের আওতায় নেই, তাদের ‘প্রগতি’ স্কিমে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ছাড়া বিদেশগামী কর্মীদের ‘প্রবাস’ স্কিমে যুক্ত করার বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিদেশ যাওয়ার আগে ডিপার্চার ওরিয়েন্টেশনের সময় তাদের এ বিষয়ে জানানো হবে। একই সঙ্গে তাদের হাতে লিফলেট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তুলে দেওয়া হবে।
সরকারি ব্যবস্থায় বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে ‘প্রবাস’ স্কিমে নিবন্ধনকে শর্ত করার বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে।
ঋণ ও স্বাস্থ্যবিমা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়
সার্বজনীন পেনশন তহবিল থেকে ঋণ দেওয়ার বিষয়েও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ঋণ দেওয়া হলে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন নিশ্চিত করা যাবে কি না, সুদের হার কত হবে এবং অন্যান্য শর্ত কী থাকবে, সেগুলো পর্যালোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সার্বজনীন পেনশনের আওতায় স্বাস্থ্যবিমা চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এখনই স্বাস্থ্যবিমা চালু করা হচ্ছে না। একচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্ভাব্য আর্থিক চাপ ও ঝুঁকি যাচাই করার পর এ বিষয়ে মডেল চূড়ান্ত করা হবে।
আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়াতে সরকারি অডিটের পাশাপাশি একটি বেসরকারি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) ফার্ম দিয়ে অডিট করানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, সরকারি নিয়মে সাধারণ অডিটের পাশাপাশি নির্বাচিত একটি বেসরকারি সিএ ফার্ম দিয়ে অডিট করানো হবে। এতে কর্তৃপক্ষের হিসাব ও আর্থিক কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।