সিনেমায় অভিনয়ের জন্য কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়েছিল। এমনকি শুটিংয়ের জন্য নিজের সময়ও দিয়ে রেখেছিলেন তাপসী পান্নু। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাঁকে জানানো হয়, ছবিটিতে আর অভিনয় করা হচ্ছে না। কারণ শুনে অবাক হয়েছিলেন বলিউডের এই অভিনেত্রী। তাঁকে বলা হয়েছিল, সিনেমার নায়ককে তাঁর স্ত্রী তাপসীকে পছন্দ করেন না।
সম্প্রতি নিজের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এই ঘটনা সামনে আনেন তাপসী। তিনি জানান, তখন অভিনয়জগতে নতুন থাকায় এমন অনেক পরিস্থিতিকে কাজের স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই মেনে নিয়েছিলেন। পরে অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে বুঝেছেন, এসব ঘটনার মধ্যে ক্ষমতার অসমতা ও বৈষম্যের বিষয়ও ছিল।
২০২০ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও তাপসী জানিয়েছিলেন, একটি সিনেমা থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছিল নায়কের স্ত্রীর আপত্তির কারণে। তবে সেই সময়ও তিনি নায়ক বা তাঁর স্ত্রীর নাম প্রকাশ করেননি। সম্প্রতি সেই অভিজ্ঞতার কথা আবারও তুলে ধরে অভিনেত্রী জানান, কারণটি তাঁর কাছে ক্যারিয়ারের শুরুর দিনের সবচেয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।
সিনেমা থেকে বাদ পড়ার পাশাপাশি সংলাপ নিয়েও তাপসীর অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা রয়েছে। একটি ছবির ডাবিংয়ের সময় তাঁকে জানানো হয়েছিল, নায়ক তাঁর একটি সংলাপ পছন্দ করেননি। তাই সংলাপটি পরিবর্তন করতে হবে।
তাপসী এতে রাজি হননি। প্রয়োজনে সংলাপটি মিউট করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি। কিন্তু পরে তাঁর অমতেই অন্য একজন ডাবিং শিল্পীকে দিয়ে সেই সংলাপ রেকর্ড করা হয়। সিনেমাটি মুক্তির পর তাপসী জানতে পারেন, পুরো ছবিতে তাঁর নিজের কণ্ঠ থাকলেও ওই নির্দিষ্ট সংলাপটি অন্য একজনের কণ্ঠে ডাব করা হয়েছে।
২০২৬ সালের আগস্টে দেওয়া আরেক কথোপকথনে এ ঘটনার বিস্তারিতও জানান তিনি। একটি দৃশ্যে তাঁকে নায়ককে ‘গেট টু হেল’ বলতে হয়েছিল। দৃশ্যটি ক্লোজ শটে ধারণ করা হয়েছিল বলে সংলাপটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু ডাবিংয়ের সময় পরিচালক তাঁকে সংলাপটি পরিবর্তন করতে বলেন। কারণ জানতে চাইলে শেষ পর্যন্ত জানানো হয়, নায়ক সংলাপটি পছন্দ করেননি।
তাপসী সংলাপ বদলাতে রাজি হননি। এরপর তাঁর অমতেই অন্য একজনের কণ্ঠে সংলাপটি রেকর্ড করা হয়।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে আরও একটি সিনেমায় নিজের প্রবেশদৃশ্য নিয়েও হতাশ হয়েছিলেন তাপসী। শুট করা দৃশ্যটি তাঁর নিজেরও পছন্দ হয়েছিল। এমনকি ওই দৃশ্যটি ছবিতে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল। পরে নায়কের চরিত্রকে বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে দৃশ্যটি পরিবর্তন করা হয়। তাপসীর ভাষ্য অনুযায়ী, নায়ক চেয়েছিলেন তাঁর চরিত্রও সেখানে সমান গুরুত্ব পাক।
বিষয়টি পরিচালককে জানানোর পর যে উত্তর পেয়েছিলেন, সেটিও তাপসীর কাছে ছিল বড় ধরনের বাস্তব শিক্ষা।
এমনকি নায়কের আগের সিনেমার ব্যবসায়িক ফলও কখনো তাঁর পারিশ্রমিকের ওপর প্রভাব ফেলেছিল বলে জানিয়েছেন তাপসী। একবার তাঁকে বলা হয়েছিল, নায়কের আগের ছবি ভালো ব্যবসা করেনি। তাই বাজেট নিয়ন্ত্রণের জন্য তাঁর পারিশ্রমিক কমাতে হবে।
কখনো আবার কোনো নায়ক আপত্তি করেছেন তাপসীর চরিত্রের প্রবেশদৃশ্য নিয়ে। কারণ সেই দৃশ্য নায়কের নিজের প্রবেশদৃশ্যকে ছাপিয়ে যেতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা ছিল।
তাপসীর মতে, ক্যারিয়ারের শুরুতে এসব ঘটনা কতটা অস্বাভাবিক, তা তিনি বুঝতে পারেননি। তখন তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন ছিলেন। সময়ের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বাড়ার পর বুঝেছেন, কাজের জায়গায় নারী ও পুরুষ শিল্পীদের জন্য সবকিছু সব সময় সমান ছিল না।
সম্প্রতি সেটে লিঙ্গবৈষম্য নিয়েও কথা বলেছেন তাপসী। তাঁর দাবি, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে অভিনেত্রীদের অনেক সময় পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় ভিন্নভাবে দেখা হতো। হোটেল, গাড়ি কিংবা শুটিংয়ে উপস্থিত হওয়ার সময় নিয়েও পার্থক্য ছিল বলে জানান তিনি।
পর্দায় নিজের নারীসত্তা ও আকর্ষণকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটি নিয়েও তাপসীর উপলব্ধি বদলেছে। ২০২৪ সালে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘হাসিন দিলরুবা’ সিনেমায় অভিনয়ের সময় নিজের পর্দার যৌন আবেদনকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, এর আগে দর্শক বা নির্মাতারা তাঁকে এভাবে দেখেননি।
এসব অভিজ্ঞতা অবশ্য তাপসীর ক্যারিয়ার থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং সময়ের সঙ্গে নিজের কাজের ধরন ও পছন্দ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার হয়েছেন তিনি। ২০২০ সালের সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী জানিয়েছিলেন, এমন সিনেমাতেই কাজ করতে চান, যেগুলোতে অভিনয় করতে গিয়ে প্রতিদিন আনন্দ পান।
তাঁকে অনেকে সতর্ক করেছিলেন, নিজের পছন্দ অনুযায়ী কাজ বেছে নিলে একসময় হয়তো কাজের সুযোগ কমে যেতে পারে। কিন্তু তাপসীর কাছে নিজের পছন্দের কাজ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নারীকেন্দ্রিক সিনেমায় অভিনয় করা অভিনেত্রীদের নিয়েও ইন্ডাস্ট্রিতে আলাদা একটি ছক তৈরি হয়ে যায় বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, নারীপ্রধান ছবিতে কাজ করা অভিনেত্রীদের অনেক সময় পুরুষ তারকার বিপরীতে নায়িকা হিসেবে নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধা দেখা যায়। ফলে নিজের পছন্দের কাজের পথ হয়তো দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু সেই পথেই এগোতে চেয়েছেন তিনি।
তাপসী আরও জানিয়েছেন, বলিউডে অভিনেত্রীদের অনেক সময় নির্দিষ্ট ধরনের চরিত্রের জন্য আলাদা করে ভাবা হয়। গ্ল্যামারাস চরিত্রের জন্য যেমন কয়েকজনের একটি নির্দিষ্ট তালিকা থাকে, তেমনি সামাজিক বা বিষয়ভিত্তিক সিনেমার জন্যও আলাদা অভিনেত্রীদের কথা ভাবা হয়।
এই ধরনের ছকে নিজেকে আটকে রাখতে চান না তাপসী। তাই চরিত্র বা গল্পে নতুনত্ব না থাকলে সিনেমার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতেও দ্বিধা করেন না। এমনকি কোনো পরিচালককে তিনি সরাসরি বলেন, তাঁকে ওই চরিত্রে নিলে দর্শক সিনেমার পরিণতি আগেই অনুমান করে ফেলতে পারে।
‘পিঙ্ক’, ‘মুল্ক’, ‘থাপ্পড়’, ‘হাসিন দিলরুবা’, ‘রাশমি রকেট’, ‘লুপ লাপেটা’ ও ‘ডাঙ্কি’র মতো সিনেমায় ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন তাপসী। বড় তারকার ছবিতে তুলনামূলক ছোট চরিত্র করতেও তাঁর আপত্তি নেই, যদি চরিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ হয়।
২০২৪ সালে তাপসী জানিয়েছিলেন, বড় তারকার বিপরীতে কাজ করার ক্ষেত্রে তাঁর কাছে মূল বিষয় হলো চরিত্রটির গুরুত্ব। ছবিতে বড় নায়ক আছেন কি না, সেটিই তাঁর কাজ বেছে নেওয়ার একমাত্র মাপকাঠি নয়।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিনের নানা অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা পেরিয়ে তাপসী এখন নিজের পছন্দের চরিত্র ও গল্প বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট। তাঁর কথায় উঠে এসেছে, অভিনয়জগতে টিকে থাকার পাশাপাশি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকাটাও তাঁর পথচলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও ফিল্মফেয়ার অবলম্বনে