বিমানের বহর বাড়াতে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী অক্টোবরেই এ নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের সঙ্গে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। নতুন এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ ধাপে ধাপে বহরে যুক্ত হলে ভবিষ্যতে বিমানের নিজস্ব বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা ৫০ ছাড়াতে পারে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন বিমানমন্ত্রী।
মন্ত্রী জানান, এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আলোচনা চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী অক্টোবরেই চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রস্তাবিত উড়োজাহাজগুলোর মধ্যে চারটি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি এবং ছয়টি এ৩২১নিও ন্যারোবডি উড়োজাহাজ রয়েছে।
এয়ারবাস কেনার বিষয়ে কোনো চাপ বা শর্ত রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, দেশের প্রয়োজন ও ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যেই উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। কোন দেশ বা কোন নির্মাতার কাছ থেকে কতটি উড়োজাহাজ কেনা হবে, সেটি বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত বলেও জানান তিনি।
বিমানমন্ত্রী বলেন, কোন উড়োজাহাজ বাংলাদেশের জন্য উপযোগী হবে, কোথা থেকে কিনলে দেশ বেশি লাভবান হবে এবং কার কাছ থেকে কতটি কেনা হবে, এসব বিষয় বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, কোনো চাপের কারণে নয়, প্রয়োজনের ভিত্তিতেই বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের সঙ্গে মোট ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে আগের চুক্তির ১৪টি এবং নতুন করে চুক্তিবদ্ধ ১১টি উড়োজাহাজ রয়েছে। নতুন ১১টি বোয়িংয়ের মধ্যে পাঁচটি ৭৮৭-১০ ওয়াইডবডি এবং ছয়টি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স ন্যারোবডি। এ ১১টি উড়োজাহাজ কিনতে প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
সব মিলিয়ে ২৫টি বোয়িংয়ের মধ্যে ১৫টি ওয়াইডবডি এবং ১০টি ন্যারোবডি উড়োজাহাজ থাকবে। এসব উড়োজাহাজ একসঙ্গে দেশে আসবে না। চুক্তি অনুযায়ী প্রথম বোয়িং উড়োজাহাজটি ২০৩১ সালে দেশে আসার কথা রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে ২০৩৫ থেকে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত উড়োজাহাজগুলো সরবরাহ করা হবে।
তবে প্রথম উড়োজাহাজটি নির্ধারিত সময়ের আগেই পাওয়ার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। ২০২৭ বা ২০২৮ সালের মধ্যে অন্তত একটি উড়োজাহাজ সরবরাহের জন্য বোয়িংয়ের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানান বিমানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, চুক্তি স্বাক্ষর করলেই সব উড়োজাহাজের জন্য এখনই অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। একটি করে উড়োজাহাজ দেশে আসার পর সে অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা হবে। নতুন উড়োজাহাজের আয় থেকেই এ অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিমানমন্ত্রী বলেন, দেশের এভিয়েশন খাতকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বর্তমানে এ খাতের সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। উদাহরণ হিসেবে তিনি ইথিওপিয়ার কথা তুলে ধরে বলেন, দেশটির জিডিপি বাংলাদেশের চেয়ে কম হলেও ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের বহরে ১৬৭টি উড়োজাহাজ রয়েছে এবং দেশটির অর্থনীতিতে এভিয়েশন খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
বাংলাদেশের বর্তমান বহর নিয়েও উদ্বেগের কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে মোট ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্রায় গ্রাউন্ডেড হওয়ার অবস্থায় রয়েছে। ফলে কার্যকরভাবে প্রায় ১৭টি উড়োজাহাজ দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে। বর্তমান উড়োজাহাজগুলোর একটি অংশ আগামী ১০ বছরের মধ্যে পুরোনো হয়ে যাবে বলেও জানান তিনি।
এ কারণে আগামী ২০, ২৫ কিংবা ৩০ বছর পর বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত কোথায় থাকবে, সেই পরিকল্পনা সামনে রেখেই এখন থেকে বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান বিমানমন্ত্রী।
এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ এবং বোয়িংয়ের ২৫টি উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি বর্তমানে সচল থাকা ১৭টি উড়োজাহাজ হিসাব করলে ভবিষ্যতে বিমানের বহরে ৫০টির বেশি উড়োজাহাজ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন উড়োজাহাজগুলো পর্যায়ক্রমে ২০৩৬, ২০৩৭ এমনকি ২০৪০ সাল পর্যন্ত বহরে যুক্ত হতে পারে বলে জানান তিনি।
নতুন উড়োজাহাজ হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতেও বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য অন্তত ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন বিমানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, নতুন উড়োজাহাজগুলো দেশে আসতে সময় লাগবে। এর মধ্যে বিমানবন্দরের অবকাঠামো ও ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ছে। তাই লিজে উড়োজাহাজ এনে বহর বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে বিদ্যমান স্লটগুলো আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়।
মন্ত্রী জানান, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রুটে বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোই বেশি যাত্রী পরিবহন করছে। জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বর্তমানে দেশের মোট যাত্রীর প্রায় ২০ শতাংশ নিজস্ব উড়োজাহাজ দিয়ে পরিবহন করতে পারছে। বহর বাড়ানো গেলে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে আরও ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
নতুন রুট চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। নিউইয়র্কে পুনরায় ফ্লাইট চালুর চেষ্টা চলছে। সিডনি রুট চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। জাপানে বর্তমানে একটি ফ্লাইট রয়েছে এবং সেখানে দ্বিতীয় ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নিয়েও কথা বলেন বিমানমন্ত্রী। তিনি জানান, একনেক সভায় টার্মিনালের কিছু ক্রয়সংক্রান্ত বিষয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনালের আংশিক উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। পুরোপুরি কার্যক্রম সম্পন্ন হতে এরপর আরও পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে।
টার্মিনাল চালু হলে যাত্রীদের ভোগান্তি কমানোর জন্য সেবার নির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারণ করা হবে বলে জানান তিনি। বিমান থেকে যাত্রী নামার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাগেজ সরবরাহ করতে হবে। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, লাগেজ পেতে ১২ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে সময় লাগার লক্ষ্য থাকবে। নির্ধারিত সেবা দিতে ব্যর্থ হলে টার্মিনাল হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা দিতে হবে।
মন্ত্রী আরও জানান, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্বোধন করবেন।
বিমানমন্ত্রী বলেন, এভিয়েশন খাতের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে দেশের যাত্রীদের আরও বেশি অংশ নিজস্ব এয়ারলাইনসের মাধ্যমে পরিবহন করা সম্ভব হবে। এতে এ খাতের আয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের অর্থ দেশের মধ্যেই রাখার সুযোগ তৈরি হবে। বহর সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন গন্তব্যে ফ্লাইট চালু এবং যাত্রীসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বোয়িং ও এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। বহর সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের মতো বড় আকারে সক্ষমতা তৈরির দিকেও নজর রয়েছে বলে উল্লেখ করেন বিমানমন্ত্রী।