রামু সহিংসতার ১৪ বছর আজ। ১৪ বছরে বৌদ্ধদের মাঝে ফিরেছে সম্প্রীতি। দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাশৈলীতে নির্মিত বিহারগুলোতে পূণ্যার্থীদের পাশাপাশি বেড়েছে পর্যটক আকর্ষণ। পুজাপার্বন, ধর্মীয় উৎসবে অন্যধর্মালম্বীর সরব উপস্থিতে মুখরিত হয় এখন বিহার প্রাঙ্গন। সম্প্রীতিতে ফিরতে পারায় খুশি বৌদ্ধরা। তবে মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় আদালতে হাজিরা দেয়া নিরীহ লোকজনের মাঝে বিরাজ করছে ক্ষোভ। পুলিশের দায়েরকৃত এসব মামলা নিয়ে শুরু থেকে ছিলো বিতর্ক। রাজনৈতিক দলের নেতাদের টার্গেট, নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে পুলিশের দায়েরকৃত মামলায় জড়ানো হয় অসংখ্য নিরীহ লোকজনকে। আবার বিভিন্ন এলাকার লোকজন পুলিশকে ম্যানেজ করে এসব মামলায় ফাঁসাতে নাম জড়িয়ে দেয়।
এ ঘটনায় বৌদ্ধ সম্প্রদায় কোন মামলা করেনি। তবে পুলিশের দায়েরকৃত বিতর্কিত মামলাগুলোতে আদালতে বছরের পর বছর হাজিরা দিয়ে নিরীহ লোকজনকে পোহাতে হচ্ছে চরম দূর্ভোগ। স্বাক্ষীর অভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে না এসব মামলা। পুলিশ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়ার পরও ১৪ বছরেও একটি মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। বার বার নোটিশের পরও স্বাক্ষীরা না আসায় মামলাগুলো এখন খারিজ হওয়ার পথে। অর্থাৎ মামলার বিচারপ্রক্রিয়া এখন যেন থমকে আছে।
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামু, ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া ও টেকনাফের বৌদ্ধ বিহার, বৌদ্ধ পল্লীতে হামলা ও অগ্নিসংযোগে ১৯ বৌদ্ধ বিহার, ৪১ বসতঘর পুড়িয়ে দেয় দূর্বৃত্তরা। ভাংচুর ও লুটপাট করা হয় আরো ৬টি বৌদ্ধ বিহার সহ অর্ধশত বৌদ্ধ বসতঘরে। এতে কয়েক শত বছরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পুড়ে যায়। ঘটনার পরপরই পোড়া মন্দিরে তৈরী হয়েছে নান্দনিক স্থাপনা। এ ঘটনার পর মামলা দায়ের করা হলেও নারকীয় হামলার বিচারপ্রক্রিয়া ১৪ বছরেও শেষ হয়নি। সাক্ষীর অভাবে এ বিচার প্রক্রিয়া থমকে আছে।
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ভয়াল রাতে দুষ্কৃতিকারীদের আগুনে বসত ঘরে পুড়ে যায় এডভোকেট সুমথ বড়ুয়ার। তিনি জানান- বর্তমানে পুলিশের দায়েরকৃত মামলাগুলোয় অনেক নিরীহ মানুষ হয়রানি হচ্ছে। যা নিয়ে উল্টো মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। তাই এ ঘটনায় একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে প্রকৃত আসামীদের আইনের আওতায় আনা হোক। এতে নিরীহ লোকজনও আর হয়রানি হবে না।
ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধদের আক্ষেপ ও অভিযোগ হলো মামলার আসামী, সাক্ষীর সাক্ষ্য দেয়া নিয়ে। বৌদ্ধরা মনে করেন, মামলার আসামী এবং মামলার সাক্ষী হিসেবে যাদের নাম দেয়া হয়ে ছিলো, তাদের নাম যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এখন যাদের নাম সাক্ষীর তালিকায় আছে, তাদের অনেকেই জানে না সাক্ষীর তালিকায় তাদের নাম রয়েছে। এ কারণে ১৪ বছর পরও বিচারপ্রক্রিয়ার অচলাবস্থা নিয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মাঝে রয়েছে এখনও অসন্তোষ।
রামু সহিংসতার সেই কালো রাতের ঘটনা স্মরণ করে রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের পরিচালক শীলপ্রিয় থের বলেন, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর আমাদের বৌদ্ধ বিহারগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। সেই সম্পদ ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। সেই সময়ে কিছু দুর্বৃত্তের একটি রাত ছিলো। ঘটনাটি স্মরণ করলে এখনও চোখ দিয়ে জল বাহির হয়ে যায়। কঠিন সময় গেছে আমাদের। দূর্বৃত্তরা আমাদের বৌদ্ধ বিহার ও বৌদ্ধ পল্লী পুড়িয়ে দিয়ে অনেক ক্ষতি করেছে। তিনি বলেন, আমরা হারিয়ে যাওয়া দিনের চেয়ে, বর্তমানে অনেক সম্প্রীতি ভোগ করছি। এখন আমাদের সম্প্রীতি অনেক বৃদ্ধি হয়েছে। আমরা রামুবাসিরা সম্প্রীতিতে আছি। আগামী দিনেও আমাদের এ সম্প্রীতি ধরে রাখতে হবে।
জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পবিত্র কোরআন অবমাননার গুজব ছড়িয়ে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রামুর ১২ বৌদ্ধ বিহার, ৩০টি বসতঘর, পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া ও টেকনাফে ৭টি বৌদ্ধ বিহার, ১১টি বসতঘর পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। পুড়ে যায় এসব মন্দিরে থাকা হাজার বছরের প্রত্নতাত্ত্বিক সব নিদর্শন। লুটপাট ও ভাংচুর করা হয় আরো ৬টি বৌদ্ধ বিহার, অর্ধশত বৌদ্ধ বসতঘরে। এ ঘটনার পর দায়ের করা হয় ১৯টি মামলা। এর মধ্যে রামুর আটটি মামলায় ৪৫৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। তবে রামু থানায় জনৈক সুধাংশু বড়ুয়ার করা মামলাটি দু’পক্ষের আপস মীমাংসার ভিত্তিতে প্রত্যাহার করা হয়।
কক্সবাজার বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, রামু সহিংসতার ১৪ বছরে ফিরে এসেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। রামুর বৌদ্ধরা পেয়েছে দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ বিহার। কিন্তু রামুর ঘটনার মামলার কার্যক্রম থমকে আছে। পুলিশ মামলার অভিযোগপত্র আদালাতে জমা দিলেও একটি মামলাও নিষ্পত্তি হয়নি। সেই মামলার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা সংশয়।
বৌদ্ধদের অভিযোগ, ২০১২ সালের ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর রামু ও উখিয়া-টেকনাফে বৌদ্ধপল্লীতে চালানো নারকীয় হামলার ১৮ মামলার একটি বিচারও শেষ হয়নি। ন্যাক্কারজনক এ ঘটনায় দায়ীরা কেউ শাস্তি পায়নি এখনও। ঘটনারপর বিভিন্ন মামলায় ৯৯৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। এ ঘটনায় আটকরা সবাই এখন জামিনে। অনেকেই বিদেশে পাড়ি দিয়েছে। ঘটনার পরপরই ক্ষতিগ্রস্থ বৌদ্ধ বিহার ও ঘরবাড়ি পুণনির্মাণ করে দিয়েছে সরকার। দীর্ঘ ১৪ বছরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আবারও ফিরে এসেছে বলে জানান রামুর বৌদ্ধরা।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পি.পি) অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ইউনুস জানিয়েছেন- কয়েকটি মামলায় স্বাক্ষীরা আসলেও অনেক মামলায় স্বাক্ষীরা এখনো সাক্ষ্য দিতে আসেননি। সাক্ষীরা যদি যথাযথ সাক্ষ্যদান করেন, তাহলে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি দিয়ে বিচারকার্য সম্পন্ন করা যাবে এবং ঘটনার সত্য উদঘাটন হবে। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রামু ট্র্যাজেডির ঘটনায় ফেইসবুকে কোরআন অবমাননার ছবি ট্যাগকারী সেই উত্তম বড়ুয়া বর্তমানে সপরিবারে ফ্রান্সে অবস্থান করছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবি দেখে এ ধারনা করা হচ্ছে। এরআগে রামুতে বৌদ্ধ বিহার পোড়ানোর দিন থেকেই আত্মগোপনে ছিলেন উত্তম বড়ুয়া।