সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম

রংপুর বিভাগের উন্নয়নে রাজপথে সোচ্চার হওয়ার ঘোষণা

এফএনএস (মমিনুল ইসলাম রিপন; রংপুর) :
| আপডেট: ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম | প্রকাশ: ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম
রংপুর বিভাগের উন্নয়নে রাজপথে সোচ্চার হওয়ার ঘোষণা

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, সাংবিধানিক সংস্কার এবং উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করতে সংসদের পাশাপাশি রাজপথে সোচ্চার হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর, রংপুর বিভাগীয় উন্নয়ন ফোরামের আহ্বায়ক ও রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম।

শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টায় রংপুর নগরীর শাপলা চত্বরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহানগর কার্যালয়ে রংপুর বিভাগীয় উন্নয়ন ফোরামের আয়োজনে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, উত্তরবঙ্গ বিশেষ করে রংপুর বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার। ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে এ অঞ্চলের জন্য বিশেষ বরাদ্দ ও পৃথক উন্নয়ন কর্মসূচি নিতে হবে।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলো সনদের বিভিন্ন দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করলেও পরবর্তী সময়ে এর বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ সরাসরি নির্বাচিত আসনের মধ্যে ২১০টি আসন পায় এবং জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে আসে। একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে জুলাই সনদের সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি দাবি করেন, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তা রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নকে জটিল করেছে। তিনি বলেন, সংসদে সমাধান না হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন তিনি। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাম্প্রতিক ঘটনাকে তুলে ধরে এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দল-মত নির্বিশেষে সমান আচরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করতে প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহারের অভিযোগও তিনি তোলেন।

তিনি বলেন, অতীতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেও জনগণের আন্দোলনের মুখে টিকে থাকতে পারেনি। বর্তমান সরকারকেও জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক ঐকমত্যকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। প্রেস ব্রিফিংয়ে রংপুর বিভাগের উন্নয়নের জন্য একাধিক দাবি তুলে ধরেন জামায়াতের এই সংসদ সদস্য। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে। এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন সেই অবস্থান অনেকটা নরম হয়ে এসেছে। কোনো বিদেশি চাপের কারণে প্রকল্পটি থেকে সরে আসা হলে রংপুরের মানুষ তা মেনে নেবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, রংপুর বিভাগের উন্নয়নে শুধু সাধারণ বরাদ্দ নয়, বঞ্চনার মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে ‘ইনসাফপূর্ণ’ বণ্টন প্রয়োজন।

তিনি “তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন;

“দিনাজপুরের মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনির দ্বিতীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন; “সৈয়দপুর বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন; “দ্বিতীয় যমুনা সেতু দ্রুত নির্মাণ; “রংপুর বিভাগের রাস্তাঘাট, সেতু ও কালভার্টসহ অবকাঠামোর বিশেষ উন্নয়ন; “বিভাগের উপজেলাগুলোতে সরকারি মহিলা কলেজ স্থাপন; “নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ; “রংপুর বিভাগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা; “রংপুরে গ্যাস সরবরাহ চালু; “রেল যোগাযোগ আধুনিকায়ন ও ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি; “সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাকে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা; “রংপুর অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলার দাবী জানান। মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনির দ্বিতীয় প্রকল্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে হার্ড রকের চাহিদার তুলনায় স্থানীয় উৎপাদন খুবই কম। দ্বিতীয় খনি বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আনার সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি দাবি করেন। সৈয়দপুর বিমানবন্দর সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমানে বিমান চলাচল বাড়লেও বিমানবন্দরের সক্ষমতা সীমিত। উত্তরাঞ্চলের মানুষের ঢাকা ও দেশের বাইরে যাতায়াতের কথা বিবেচনায় নিয়ে বিমানবন্দরটির আধুনিকায়ন প্রয়োজন।

রেল যোগাযোগ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। দ্রুতগতির ট্রেন চালু, ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো এবং সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাকে কার্যকর করার দাবি জানান। রংপুর বিভাগের উন্নয়ন বৈষম্য প্রসঙ্গে এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, তারা শুধু ‘সমান অধিকার’ চান না; বরং পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বেশি বরাদ্দ চান। তার ভাষায়, উন্নত অঞ্চলের সঙ্গে একই পরিমাণ বরাদ্দ দিলে পিছিয়ে থাকা অঞ্চল কখনোই সেই ব্যবধান পূরণ করতে পারবে না। তাই রংপুর বিভাগের জন্য বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, রংপুর বিভাগের বিপুল জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার শিকার। এ অঞ্চলের মানুষকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই ন্যায্য নয়। সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেশের উন্নয়নের প্রধান বাধা অর্থ বা সম্পদের ঘাটতি নয়; বরং দুর্নীতি ও অযোগ্য নেতৃত্ব। এ ক্ষেত্রে তিনি অতীতে প্রকাশিত অর্থপাচারসংক্রান্ত বিভিন্ন হিসাবের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন এবং সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, রংপুর বিভাগের উন্নয়ন কোনো একক দলের দাবি নয়; এটি এ অঞ্চলের মানুষের ন্যায্য অধিকার। সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সাংবাদিক, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এ দাবিগুলো সামনে এগিয়ে নেওয়ার কথা জানান তিনি।

তিনি বলেন, “রংপুর বিভাগের উন্নয়ন আমাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়, এটি এ অঞ্চলের মানুষের ন্যায্য অধিকার।” এসময় উপস্থিত ছিলেন, রংপুর উন্নয়ন ফোরামের সদস্য সচিব ও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর মহানগর জামায়াতের আমির এটিএম আজম খান, রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রায়হান সিরাজী, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. গোলাম রব্বানী, কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান, নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুস সাত্তার, নীলফামারী-২ আসনের সংসদ সদস্য আলফারুক আব্দুল লতীফ, নীলফামারী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ওবায়দুল্লাহ সালাফী, নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম, গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজেদুর রহমান, গাইবান্ধা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল করিম, গাইবান্ধা-৩ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কাওছার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এবং গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল ওয়ারেছ।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে