ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:০৬ এএম
ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও আশঙ্কাজনক ও জটিল রূপ ধারণ করতে পারে বলে তীব্র সতর্ক বার্তা দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কীটতত্ত্ববিদেরা। তাঁরা বলছেন, অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আরও বৃদ্ধি পাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর চলমান ভয়াবহতার মধ্যে এডিস মশার আচরণ, সংক্রমণ প্রক্রিয়া এবং রোগীদের হাসপাতালে আসার ধরন নিয়ে প্রচলিত নানা ভুল ধারণা ও সামাজিক অনীহা এই সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে। লোকদেখানো স্থানীয় পদ্ধতির বদলে এখন প্রমাণভিত্তিক বৈজ্ঞানিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এদিকে, দেশে ডেঙ্গুর সামগ্রিক প্রাদুর্ভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আক্রান্তের তালিকায় পুরুষদের পাল্লা ভারী হলেও প্রাণহানির ক্ষেত্রে নারীরা আশঙ্কাজনকভাবে এগিয়ে রয়েছেন। একই সঙ্গে ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ সমাজকে এই ভাইরাসের প্রধান শিকারে পরিণত হতে দেখা যাচ্ছে। আক্রান্ত ও মৃত্যু-উভয় ক্ষেত্রেই তরুণদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনক। তরুণেরা জৈবিকভাবে ডেঙ্গুর প্রতি বেশি সংবেদনশীল না হলেও তাদের প্রতিদিনের জীবনাচরণই তাদের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ফেলছে। শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী হওয়ার কারণে দিনের বড় একটি সময় তাদের বাইরে কাটাত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, দফতর কিংবা নির্মাণস্থলের মতো জায়গায় যেখানে মশক নিধন ব্যবস্থা দুর্বল থাকে, সেখানে তাদের কামড় খাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া কর্মজীবী মানুষ ছুটির বা মেডিকেল-সনদের প্রয়োজনে দ্রুত হাসপাতালে আসায় প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে তরুণ ও পুরুষদের ডেঙ্গু শনাক্তের হার বেশি ফুটে ওঠে। অন্যদিকে, আক্রান্তের তালিকায় সংখ্যায় কম থাকা সত্ত্বেও নারীদের মৃত্যুহার বেশি হওয়ার পেছনে সামাজিক প্রেক্ষাপট, সচেতনতার অভাব এবং শারীরিক জটিলতাকে দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকেরা। পারিবারিক কাঠামোর কারণে নারীরা অসুস্থ হলেও সংসার ও স্বজনদের অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে নিজেদের জ্বর বা অসুস্থতা চেপে রাখেন এবং সঠিক সময়ে পরীক্ষা না করিয়ে অবহেলা করেন। এছাড়া পরিবারে চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও আর্থিক বিষয়গুলো পুরুষের হাতে কেন্দ্রিক থাকায় নারীদের অনেক সময় একদম আশঙ্কাজনক বা জটিল অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়, যা চিকিৎসায় বড় ধরনের বিলম্ব ঘটায়। এর পাশাপাশি গর্ভাবস্থা, অনিয়ন্ত্রিত রক্তপাত, রক্তস্বল্পতা এবং শারীরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার তারতম্য নারী রোগীদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গুকে আরও বেশি প্রাণঘাতী করে তোলে। এই পরিস্থিতি সামলাতে জ্বর হওয়া মাত্রই নারীদের দ্রুত পরীক্ষা করানো এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নারী রোগীদের প্রসূতি ও মেডিসিন বিভাগের যৌথ ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এদিকে, ডেঙ্গুর ধরন পরিবর্তন নিয়েও নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, চলতি বছর ডেঙ্গুর ডিইএনভি-থ্রি ধরনটি সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যে ডিইএনভি-টু ধরনটি বেশি সক্রিয় ছিল, এবার সেটি পিছিয়ে পড়েছে। আইইডিসিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নয়টি হাসপাতালে সংগৃহীত ১ হাজার ৯৭টি এনএস-ওয়ান পজিটিভ নমুনার মধ্যে ৭১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এসব নমুনার ৯১ দশমিক ৫ শতাংশে ডিইএনভি-থ্রি এবং বাকি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে ডিইএনভি-টু পাওয়া গেছে। ঢাকায় ডিইএনভি-থ্রি বেশি দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে রাজধানীর বাইরে ডিইএনভি-টু শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া বান্দরবান ও বরগুনায় পরীক্ষা করা সব নমুনাতেই ডিইএনভি-টু পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন ব্যক্তি ডেঙ্গুর একটি ধরনে আক্রান্ত হলে ওই ধরনের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু বাকি তিন ধরনের বিরুদ্ধে তিনি সুরক্ষিত থাকেন না। ফলে পরবর্তীতে ভিন্ন ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এদিকে, এডিস মশার প্রজনন ও আচরণগত স্বভাব নিয়ে সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ভুল ধারণাও প্রতিরোধ প্রক্রিয়ায় বড় বাধা তৈরি করছে বলে জানান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও চিকিৎসা কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার। তিনি উল্লেখ করেন, এডিস মশা কেবল দিনে কামড়ায় আর রাতে কামড়ায় না-এই ধারণাটি বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল; কৃত্রিম আলোর উপস্থিতি থাকলে এডিস মশা রাতেও সমানভাবে কামড়াতে সক্ষম। এছাড়া শীতের শুরুতে কিউলেক্স মশার দাপট বাড়লে মানুষ এডিস মশার হুমকিকে উপেক্ষা করে, অথচ এ সময়ও সমান সতর্ক থাকা প্রয়োজন। মশা দমনে বহুল ব্যবহৃত ‘ফগিং’ পদ্ধতির কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, এডিসের বিরুদ্ধে কেমিক্যাল ফগিং মোটেও কার্যকর নয়, বরং তা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিধায় এটি অবিলম্বে বন্ধ করে সমন্বিত উপায়ে উৎসে মশা ধ্বংস করা উচিত। ডেঙ্গু সংক্রমণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি আরও সতর্ক করেন যে, কোনো এডিস মশা একজন ডেঙ্গু রোগীকে কামড়ানোর পরপরই অন্য কাউকে কামড়ালে সঙ্গে সঙ্গেই ভাইরাস ছড়ায় না; মশার শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রামক হতে অন্তত দুই দিন সময় লাগে। এ কারণেই পরিবারে একজনের ডেঙ্গু হওয়ার কয়েক দিন পর একে একে অন্য সদস্যরা আক্রান্ত হন। তাই গৃহস্থালি পর্যায়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পরিবারে একজন সদস্যের ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ির সব মশা মেরে ফেলা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামনের অক্টোবরের সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে বৈজ্ঞানিক উপায়ে এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি ঘরোয়া পর্যায়ে প্রতিটি পরিবারকে সচেতন থাকতে হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে