বৈচিত্র্যের অভাবে তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধিতে পিছিয়ে বাংলাদেশ

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:০৮ এএম
বৈচিত্র্যের অভাবে তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধিতে পিছিয়ে বাংলাদেশ

বৈশ্বিক বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধির বিচারে প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও), রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের (আইটিসি) সামপ্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি থমকে গেছে। গত এক বছরে বিশ্বজুড়ে পোশাক বাণিজ্য চার শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছালেও বাংলাদেশে তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে মাত্র দশমিক ৮৯ শতাংশ। বিপরীতে কম্বোডিয়া প্রায় ১৭ শতাংশ, ভিয়েতনাম সাড়ে ১০ শতাংশ, পাকিস্তান ৬ শতাংশ এবং ভারত সাড়ে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। ডব্লিউটিওর ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিসটিকস: কি ইনসাইটস অ্যান্ড ট্রেন্ডস ইন ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, টানা দুই বছর ধরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩৮ বিলিয়ন ডলারের ঘরেই আটকে আছে। গত বছর দেশ থেকে মোট ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। সার্বিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে কম হওয়ায় বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অর্জিত বাজার হিস্যা ৭ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশে নেমে এসেছে। বাণিজ্যযুদ্ধ ও শুল্কনীতির প্রভাবে বিশ্ববাজারে শীর্ষ রপ্তানিকারক চীনের বাজার হিস্যা সাড়ে ৩১ শতাংশ থেকে কমে ২৭ দশমিক ৩৫ শতাংশে নামলেও সেই খালি হওয়া বাজার দখলের সুযোগ বাংলাদেশ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। উল্টো সেই সুবিধা লুফে নিয়েছে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া। চীন গত বছর ১৫৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করে শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও দ্বিতীয় স্থানে থাকা বাংলাদেশের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে ভিয়েতনাম, যাদের রপ্তানি আয় ৩৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং বৈশ্বিক বাজার হিস্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ হলো রপ্তানি ঝুড়িতে মৌলিক বা ‘বেসিক’ পণ্যের অতিরিক্ত আধিক্য এবং পণ্য বৈচিত্র্যের অভাব। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও আইটিসির তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণা সংস্থা ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস’ (বিএভি) জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া মোট পোশাকের ৭৬ দশমিক ৯৪ শতাংশই বেসিক ক্যাটাগরির। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে বটমওয়্যার বা প্যান্টজাতীয় পোশাক, যা মোট রপ্তানির ৩৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অথচ বিশ্ববাজারে প্যান্টের অংশ মাত্র ২১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। একইভাবে দেশের পোশাক রপ্তানির ১৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ আসছে টি-শার্ট থেকে, যার বিপরীতে বিশ্ববাজারে টি-শার্টের বৈশ্বিক হার ১০ দশমিক ০৯ শতাংশ। সব মিলিয়ে বিশ্ব পোশাক বাণিজ্যে বেসিক পণ্যের অংশ ৬১ দশমিক ৫৮ শতাংশ হলেও বাংলাদেশ বিশ্ববাজারের তুলনায় এসব মৌলিক পণ্যের ওপর প্রায় ১৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি নির্ভরশীল। অন্যদিকে, বিশ্ববাজারে তুলনামূলক বেশি চাহিদা ও উচ্চমূল্যের পোশাকের রপ্তানিতে বাংলাদেশের উপস্থিতি এখনো বেশ নগণ্য। আউটারওয়্যার, ড্রেস, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যার ও স্যুটের মতো উন্নত ও বিশেষায়িত পোশাক বিশ্ব পোশাক বাণিজ্যের ৩০ দশমিক ৪৬ শতাংশ দখল করে রাখলেও বাংলাদেশের মোট রপ্তানিতে এসব পণ্যের অংশ মাত্র ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। সবচেয়ে বড় ব্যবধান দেখা যায় আউটারওয়্যারের ক্ষেত্রে, যেখানে বৈশ্বিক বাণিজ্যের হার ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ হলেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ মাত্র ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এ ছাড়া পোশাক তৈরির আনুষঙ্গিক ছোট অ্যাকসেসরিজের বৈশ্বিক বাণিজ্যে ৭ দশমিক ৫২ শতাংশ অংশ থাকলেও বাংলাদেশের ঝুড়িতে এর উপস্থিতি মাত্র শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ, যা বিশ্ববাজারের তুলনায় প্রায় ২১ গুণ কম। রপ্তানি খাতের এমন বাস্তবতায় শিল্প মালিক ও বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রবৃদ্ধির এই করুণ চিত্রকে অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে জানান, কম্বোডিয়া ও ভারত সরকারি সহায়তায় আগ্রাসী বিপণন চালাচ্ছে এবং ভিয়েতনাম তাদের দক্ষতা, পেশাদারি ও পণ্য বৈচিত্র্যের মাধ্যমে একটি টেকসই কাঠামো গড়ে তুলেছে। তিনি বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে যাচ্ছে তা অনুসন্ধান করে অবিলম্বে ভিয়েতনামের আদলে একটি জাতীয় কর্মকৌশল চূড়ান্ত করার জোর দাবি জানান। একই সুর ফুটে উঠেছে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেলের বক্তব্যে। তিনি জানান, শুধু পণ্যের ভলিউম বা পরিমাণ বাড়িয়ে ভবিষ্যতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে এখন ‘ভলিউম’ থেকে ‘ভ্যালু’ অর্থাৎ উচ্চ মূল্যসংযোজনের দিকে নজর দিতে হবে। কটন বা সুতি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সিনথেটিক, নন-কটন, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল ও স্পোর্টসওয়্যারের মতো উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানো সময়ের দাবি। এর জন্য ডাইং, ফিনিশিং, ডিজাইন ও ফ্যাব্রিক তৈরিসহ পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। এদিকে, সার্বিক মন্দাভাবের মধ্যে ইতিবাচক খবর এসেছে যুক্তরাজ্যের বাজার থেকে। ইপিবির হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেড়ে ৯১৫ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। জুলাই মাসে রপ্তানিতে ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ ধস নামলেও আগস্টে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশের বড় লাফ যুক্তরাজ্যের বাজারে ইতিবাচক ধারা ফিরিয়ে এনেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রতি মাসে গড়ে ৪৫৭ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ডলারের পোশাক পাঠানো হয়েছে, যা গত অর্থবছরের মাসিক গড়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। ইপিবির বিস্তারিত ও সার্বিক হিসাবের মধ্যে রাউন্ডিং সংক্রান্ত ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ বা ১ দশমিক ৩১৩ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান থাকলেও সার্বিক পরিস্থিতি পোশাক খাতের সামনে একটি স্পষ্ট প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। বিশ্ববাজার যেখানে উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাকের দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ যদি শুধু কম দামি টি-শার্ট ও প্যান্টের ওপর ভর করে থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যয়, লিড টাইম ও উৎপাদন খরচের চাপে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে