কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়সহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দুটি সেনা ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। রামুর ১০ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের অধীনে টেকনাফের রঙ্গিখালী ও নোয়াখালীপাড়া পাহাড়ি এলাকায় ক্যাম্প দুটি স্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ক্ষতিগ্রস্ত কাঁটাতারের বেড়া পুনর্নির্মাণ, সৌরবিদ্যুতের আলো, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং কন্ট্রোল ও ওয়াচ টাওয়ার স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির দ্বিতীয় সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রঙ্গিখালী ও নোয়াখালীপাড়া পাহাড়ি এলাকায় নিয়মিত অপহরণের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষকে অপহরণ করে সেখানে নিয়ে গিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্টদের মতামতের ভিত্তিতে দুই এলাকায় সেনা ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেনাবাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি থাকলে অপহরণসহ অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে সভায় মত এসেছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে ও বাইরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে। মাদক, অস্ত্র, মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে এসব অভিযান পরিচালিত হয়। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) একজন ডিআইজির নেতৃত্বে অভিযানে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অংশ নেয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক কারবার, অনলাইন জুয়া, মানবপাচার, অস্ত্রসংক্রান্ত অপরাধ এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে। এর বাইরে প্রচলিত আইনের আওতায় নানা ধরনের সাধারণ অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে।
অপরাধ তদন্তে এপিবিএনের ভূমিকা বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। সম্প্রতি এপিবিএনের আইনগত কাঠামোয় তদন্তের সুযোগ রাখা হয়েছে। বাহিনীটিতে সাব-ইন্সপেক্টর পর্যায়ের প্রায় ৪০০ কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ায় ক্যাম্পের অপরাধ তদন্তে এপিবিএনের সদস্যরা আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবেন বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
ক্যাম্পের নিরাপত্তা জোরদারে অবকাঠামোগত কিছু সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কাঁটাতারের বেড়া পুনর্নির্মাণ করা হবে। ক্যাম্পের বাইরে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে আলোর ব্যবস্থা করা হবে। নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর পাশাপাশি কন্ট্রোল টাওয়ার ও ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা হবে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি বা সীমান্তে কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে তা মোকাবিলা করা হবে। এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের নেতৃত্বে কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা রেখে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় কমিটির সভায় পররাষ্ট্র, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড এবং রোহিঙ্গা রিফিউজি রিলিফ অ্যান্ড রিপ্যাট্রিয়েশন কমিশনারের (আরআরআরসি) প্রতিনিধিরাও সভায় ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে জাতীয় পর্যায়ের এই সমন্বয় সভা নিয়মিত হয়। সাধারণত দুই থেকে তিন মাস অন্তর সভা করে ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসন, ত্রাণ, মাদক, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়।
প্রত্যাবাসন নিয়ে আলাদা উচ্চপর্যায়ের কমিটি
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি এই সভার মূল আলোচ্য নয় জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে পৃথক উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। সেখানে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো যুক্ত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা এবং জাতিসংঘের নেতৃত্বে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “অবশ্যই সম্ভব। আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতায় এবং জাতিসংঘের নেতৃত্বে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব বলে আমরা বিশ্বাস করি। সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
তিনি বলেন, এ সমস্যার পেছনে অনেক সময় চলে গেছে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তবে খুব শিগগিরই এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা করছে সরকার।
রোহিঙ্গা অপরাধীদের জন্য পৃথক কারাগার স্থাপনের কোনো উদ্যোগ তার জানা নেই বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা অপরাধীদের জন্য আলাদা কারাগার স্থাপনের কোনো উদ্যোগ আমার জানা নেই।”
জঙ্গল সলিমপুরে পুলিশ একাডেমি, নতুন কারাগার
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সভা শেষে চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সরকারি জমির ব্যবস্থাপনা নিয়েও পৃথক বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে সরকারি জমি ও পাহাড়কে সুশাসনের আওতায় আনা এবং এলাকার নিরাপত্তা জোরদারে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রাজশাহীর সারদার আদলে জঙ্গল সলিমপুরে একটি পুলিশ একাডেমি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য জমি খোঁজা হচ্ছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তরের জন্য ৭২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। বায়েজিদ লিংক রোডের পাশে ওই জমিতে কারাগারটি স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের কাজও চলছে। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নের (ইসিবি) নেতৃত্বে সড়ক নেটওয়ার্ক নির্মাণকাজের অগ্রগতি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
এলাকাটিতে বিভিন্ন মৌজায় সরকারি জমি রয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব জমি পাহাড়ি শ্রেণির হোক বা অন্য শ্রেণির, সব জমিকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হবে।
জঙ্গল সলিমপুরে বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে বসতি স্থাপনকারীদের পুনর্বাসনের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পাশাপাশি সেখানে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “জঙ্গল সলিমপুর একসময় সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য ছিল। আমরা এলাকাটিকে সেই অবস্থা থেকে মুক্ত করে সুশাসন ও শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে চাই।”
এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র্যাব ও এপিবিএনের স্থাপনা নির্মাণের জন্য জায়গা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করে কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
পুলিশের জনআস্থা ধরে রাখার ওপর জোর
পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা প্রসঙ্গেও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, পুলিশের জন্য এখন বড় দায়িত্ব হলো জনগণের আস্থা ধরে রাখা এবং তা আরও বাড়ানো।
পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি ফিরেছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “জনআস্থা আমরা অর্জন করেছি। কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি, সেটার বিচার করবে জনগণ।”
তিনি বলেন, জনআস্থা বহাল রাখার পাশাপাশি আরও বেশি জনআস্থা প্রতিষ্ঠা করাও পুলিশের দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সেই আস্থা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জঙ্গল সলিমপুরের সভায় চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। দুটি বৈঠকেই রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও জঙ্গল সলিমপুরে নিরাপত্তা জোরদার, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হয়।