দেশের বৃহত্তর স্বার্থে জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়ন করছে সরকার: নৌপরিবহনমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম
দেশের বৃহত্তর স্বার্থে জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়ন করছে সরকার: নৌপরিবহনমন্ত্রী
ছবি: সংগ্রহীত

দেশের সমুদ্রবন্দর, নদীবন্দর ও স্থলবন্দরের ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় বাড়ানো, পরিচালন দক্ষতা উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসারে জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়ন করছে সরকার। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, এ কৌশল তৈরির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়, বন্দর কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার স্বার্থের চেয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মন্ত্রী জানান, অর্থনীতি ও বাণিজ্যের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বন্দরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিচালনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিনের এই প্রয়োজন পূরণে একটি সমন্বিত বন্দর ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া নিয়ে বিতর্ক ও প্রতিবাদের মধ্যেই জাতীয় বন্দর কৌশল নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরলেন মন্ত্রী। গত ৮ অক্টোবর এ টার্মিনাল পরিচালনার বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে চুক্তি সই হয়। চুক্তি সইয়ের আগে এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে কয়েকটি সংগঠন বিক্ষোভ করে।

শেখ রবিউল আলম বলেন, জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়নের সময় কোনো মন্ত্রণালয় বা সংস্থার নিজস্ব কর্তৃত্ব, দায়িত্ব কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান যেন সমন্বিত উদ্যোগের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তবে সমন্বয়ের অর্থ কোনো কর্তৃপক্ষের আইনগত দায়িত্ব বা কার্যক্রমের পরিধি উপেক্ষা করা নয়। বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের সমুদ্রবন্দর, নদীবন্দর ও স্থলবন্দর পৃথক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এসব বন্দরের কার্যক্রমের সঙ্গে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কাস্টমস এবং আমদানি-রপ্তানিতে যুক্ত সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সম্পৃক্ত। তাই জাতীয় বন্দর কৌশল তৈরির আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।

মন্ত্রীর ভাষ্য, কোনো একটি পক্ষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কৌশলপত্র তৈরি করা হলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। বন্দর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনদের দায়িত্ব, প্রয়োজন এবং স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

এ ক্ষেত্রে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ভবিষ্যৎ বাণিজ্যের সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় বিশেষজ্ঞদের কার্যকর সুপারিশ প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বন্দর কর্তৃপক্ষ, সরকারি সংস্থা, ব্যবসায়ী, আমদানি-রপ্তানিকারক এবং বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে কৌশলটি তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন মন্ত্রী।

জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়নের উদ্যোগে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সহযোগিতা করছেন বলে জানান শেখ রবিউল আলম। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কার্যকর কৌশলপত্র তৈরি করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

মন্ত্রী বলেন, বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। টার্মিনাল পরিচালনা, কনটেইনার হ্যান্ডলিং, পণ্য খালাস, পরিবহন সংযোগ, কাস্টমস কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট সেবাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করে বন্দর ব্যবহারকারীদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বন্দর পরিচালনায় দক্ষতা বাড়লে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সহজ হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও উদ্যোক্তাদের কার্যক্রমও গতিশীল হবে বলে মনে করেন তিনি। এর ইতিবাচক প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন বন্দরে কনটেইনার পরিচালনা ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ড, ডেনমার্কের এপি মোলার এবং সিঙ্গাপুরের পিএসএ-সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি। আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের বন্দরগুলোর দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন মন্ত্রী।

তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে বন্দর পরিচালনা, বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এ জন্য সমন্বিত নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন বলেও জানান।

শেখ রবিউল আলম বলেন, জাতীয় বন্দর কৌশল কোনো একটি মন্ত্রণালয় বা নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের একক বিষয় নয়। দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য এ কৌশলের গুরুত্ব রয়েছে। তাই ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

তিনি কৌশল প্রণয়নে যুক্ত দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও জাইকার প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানান। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কার্যকর ও সমন্বিত জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়ন সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

সেমিনারে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান বলেন, বাংলাদেশের বন্দরগুলোকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলতে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত সমাধান বের করতে হবে। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন যথেষ্ট নয়, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও জরুরি।

তিনি বলেন, দেশের বন্দরগুলোর দীর্ঘ ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রয়েছে। এসব বন্দরকে কেন্দ্র করে বহু বছর ধরে নৌযান চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে দেশের অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পরিধি বেড়েছে। তাই বর্তমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বন্দর ব্যবস্থাপনাকে আরও উন্নত ও কার্যকর করতে হবে।

সেমিনারে নৌপরিবহন সচিব জাকারিয়া, বাংলাদেশে জাইকার কান্ট্রি ডিরেক্টর তাকাহাশি জুনকো, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন বন্দরের চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে