বাইরে থেকে দেখলে পরিচ্ছন্ন ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। কিন্তু ভেতরে ঢ়ুকলেই যেন অন্য চিত্র। ৩১ টি শপের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে অর্ধেকের বেশি শপ। মাত্র কয়েকটি শপে চলে কার্যক্রম। দক্ষ শ্রমিকের অভাবে অনেক কাজ করতে হচ্ছে বাইরে থেকে। যে কাজগুলে বাইরে থেকে করা হয় তাও আবার নিম্নমানের। সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা পরিদর্শন করতে এসে মন্ত্রী নিজের চোখেই তা দেখে গেলেন। শাসিয়ে গেলেন কারখানার বিভাগীয় তত্বাবধায়ক ডিএস শাহ সুফী নুর মোহাম্মদকে। এমনকি নিম্নমানের কাজ বন্ধেরও নির্দেশ দিলেন মন্ত্রী। রেলওয়ে কারখানার ভেতরে চলছে অনিয়ম। অবসরে যাওয়া অনেক দক্ষ শ্রমিকের কাছ থেকে চুক্তি ভিত্তিক হিসেবে আবেদন নেয়া হয়েছে। ওই আবেদন পড়ে আছে বড় কর্তার টেবিলে। আর অদক্ষ টিএলআর নিয়োগ করে বেতন ভাতা দেয়া হচ্ছে অনেকটা বসে বসে। এমন অভিযোগ আবেদন করা রেলওয়ের অনেক দক্ষ শ্রমিকদের।
এদিকে রেলওয়ের আবাসিক কোয়ার্টার ভেঙে গড়ে উঠেছে মার্কেট, কোথাও বাংলোয় চলছে গরুর খামার, কোথাও চাষ হচ্ছে নেপিয়ার ঘাস। আবার রেলওয়ের আবাসিক এলাকা পরিণত হয়েছে পেঁয়াজ, রসুন, আলু ও পানসহ বিভিন্ন পণ্যের আড়ত ও ব্যবসাকেন্দ্রে। সৈয়দপুর শহরের আলু হাটিতে রেলওয়ের বেশ কয়েকটি কোয়াটার ভেঙ্গে মার্কেট করেছেন সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার রতন। রেলওয়ের জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণ, বিক্রি ও ভাড়া দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে দেশের অন্যতম বৃহৎ সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনা গড়ে তোলার জন্য একসময় প্রায় ৮০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে মূল কারখানা গড়ে ওঠে ১১০ একর জমিতে। সৈয়দপুর পৌরসভাকে লিজ দেওয়া হয় ২৫ একর জমি। ওই জমির চুক্তিপত্রের শর্ত ও অধিকার নিয়ে রেলওয়ের সাথে পৌরসভার বিরোধ রয়েছে । বিষয়টি নিয়ে মামলা চলমান থাকার কথাও উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। রেলওয়ে সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, ৮০০ একর জমির মধ্যে প্রায় ৫০০ একর সম্পত্তি রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এসব জমির কতটুকু বৈধভাবে লিজ দেওয়া হয়েছে, কতটুকু অবৈধভাবে দখল হয়েছে এবং কতটুকু অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে তার পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ হিসাব প্রকাশের দাবি উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ের একসময়ের জলাশয় ও পুকুরগুলোর অনেকগুলো ভরাট হয়ে গেছে কিংবা বেদখলে চলে গেছে। বড় বড় বাংলো ও আবাসিক স্থাপনার কোনো কোনোটিতে চলছে গরুর খামার, নেপিয়ার ঘাসের চাষ ও গুদাম ঘর কার্যক্রম। রেলওয়ের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নামেও জমি দখল করে অফিসঘর নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এসব স্থাপনার ক্ষেত্রে লিজ, বরাদ্দ ও ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
সৈয়দপুর শহরের মুন্সিপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় রেলওয়ের পুরোনো আবাসিক কোয়ার্টার ভেঙে মার্কেট ও দোকান নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, একসময় রেশন বিতরণের কাজে ব্যবহৃত একটি ঘরও লিজের নামে ভেঙে সেখানে মার্কেট করা হয়েছে। এ ছাড়া রেলওয়ে শ্রমিকলীগ নেতা অবসরপ্রাপ্ত জহিরুল হক, রুহুল আমিন মেরাজ, সাবেক শ্রমিকজোট নেতা শফিকুল ইসলাম মোমিন এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী মরহুম আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে রেলওয়ের জমি, বাংলো ও কোয়ার্টার দখলে রাখা, কোয়ার্টার বিক্রি কিংবা সেখানে বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নওগার জেবায়দুর রহমান শাহীনের বিরুদ্ধে রেলওয়ের জমি দখল ও বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন স্থানীয় ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধেও রেলওয়ের জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণ, বিক্রি ও ভাড়া দিয়ে বিপুল অর্থ উপার্জনের অভিযোগ উঠেছে। এসব ব্যক্তিদের জমির মালিকানা-সংক্রান্ত নথি, লিজের দলিল শন্দেহাতীত। একসময় রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন এলাকা এখন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, লিজের নামে প্রতারণা, অনিয়মিত বরাদ্দ এবং প্রভাবশালীদের দখলের কারণে রেলওয়ের সম্পত্তি ক্রমেই বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। কয়েকজন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা থাকার কথাও স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
রেলওয়ের সম্পত্তি বেদখল হওয়ার পেছনে ভূসম্পত্তি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পাকশী বিভাগীয় কার্যালয়ের কতিপয় কর্মকর্তা, কানুনগো, রেলওয়ের কিছু নেতা এবং কারখানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, যথাযথ তদারকি ও নিয়মিত উচ্ছেদ কার্যক্রমের অভাবে প্রভাবশালীরা রেলওয়ের জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ পাচ্ছেন। এ ছাড়া রেলওয়ের কল্যাণ ট্রাস্টের নাম ব্যবহার করেও জমি দখল ও বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। রেলওয়ের পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ কোয়ার্টারে বসবাস করছেন অনেক অসহায় ও দরিদ্র মানুষ। যাদের নিজস্ব জমিজমা বা আবাসনের বিকল্প ব্যবস্থা নেই, তাদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ বা হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। অথচ অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রেলওয়ের জমিতে বড় বড় ভবন নির্মাণ করে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, রেলওয়ের সম্পত্তি উদ্ধারে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে কি না। অবৈধ দখলদার যেই হোক, পরিচয় ও প্রভাব বিবেচনা না করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রকৃত অসহায় পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক ডিএস শাহ সুফী নুর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে নয়, বরং তাঁর উদ্যোগের বিষয়ে স্থানীয় সূত্রে ইতিবাচক বক্তব্য পাওয়া গেছে।