সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মব সৃষ্টি করে ওয়াহেদুজ্জামান সানা ওরফে শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে মামলার প্রধান অভিযুক্ত ও মূল হোতা ফজলুল হক আমিনী এখনো অধরা রয়েছেন। অন্যদিকে দেবহাটা ছাড়াও জেলার তালা ও শ্যামনগর উপজেলায় মাছ চুরি ও পারিবারিক বিরোধসহ বিভিন্ন অভিযোগে সংঘটিত পৃথক সহিংসতায় আরও তিনজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া জাকারিয়া নামক এক শিক্ষার্থী হত্যার বিচারের দাবিতে সাতক্ষীরায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
এদিকে সূত্র মতে, সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া ইউনিয়নের বড় শান্ত গ্রামের শামছুদ্দিন সানার ছেলে ওয়াহেদুজ্জামান সানা ওরফে শামীম (৩৮) ১০-১২ বছর ধরে মানসিক রোগে ভুগছিলেন। তাঁর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর কিছুটা মানসিক সমস্যা দেখা দেয় এবং তাঁর দুটি সন্তান রয়েছে। মহানবীকে কটূক্তি করেছেন এমন একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে গত সোমবার সন্ধ্যায় কিছু লোক জামায়াত অফিসের সামনে থেকে বের হয়ে তার বাড়ির গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং তাকে মারধর করে। একপর্যায়ে তিনি বিষপান করেন। পরে তাকে কুলিয়া বাজারের একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হলে মঙ্গলবার বিকেলে দক্ষিণ পারুলিয়ার ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে এবং পারুলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারী সাদিকুল ইসলামসহ শতাধিক লোক ক্লিনিক ঘেরাও করে চিকিৎসা বন্ধ করতে বলে।
সেখানে শামীমকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে এনে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে জখম করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করলে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে কয়েকশ লোক হাসপাতাল ঘেরাও করে, বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেয় এবং ওয়ার্ডের ভেতরে ঢ়ুকে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সাইফুল ইসলাম, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের জিম্মি করে শামীমকে তাদের হাতে তুলে নিতে বাধ্য করে। হামলাকারীরা তাকে ওয়ার্ডের মেঝে ও দেয়ালে আছাড় মারে এবং লাথি মেরে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রেখে যায়। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে শামীম মারা যান। অভিযুক্ত ফজলুল হক আমিনী নিহত শামীমের বিবস্ত্র ছবি নিজের ফেসবুক ও ইমো নম্বরে দেন এবং লাইভে এসে হুমকি দেন যে কোনো সাংবাদিক যেন তার পক্ষে নিউজ না করে এবং কেউ যেন তার গোসল বা জানাজায় অংশ না নেয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ফজলুল হক আমিনী বিভিন্ন সময় মব সৃষ্টি করে সহিংসতার নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই আব্দুল জলিল বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে দেবহাটা থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা ২৫০ থেকে ৩০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ বৃহস্পতিবার রাতে ও শুক্রবার ভোরে অভিযান চালিয়ে দেবহাটার সুবর্ণাবাদ গ্রামের মোক্তার হোসেন খান (৫৩) এবং নাজিরের ঘের গ্রামের আসাদুল ইসলাম মোল্যাকে (৪৬) গ্রেপ্তার করেছে। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী মাওলানা আজিজুর রহমান এক ভিডিও বার্তায় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের দলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন জানিয়েছেন, অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে চিরুনি তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে, সাতক্ষীরার তালায় মাছ চুরির সন্দেহে ক্ষিতিশ মন্ডল (৫৩) নামের এক মাছ চাষীকে গাছে বেঁধে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর ২০২৬) ভোর রাতে জিয়ালা গ্রামের উত্তর খোলা বিলে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ক্ষিতিশ মন্ডল তালা সদরের জিয়ালা গ্রামের মৃত মনিন্দ্র নাথ মন্ডলের ছেলে এবং তিনি নিজেও একজন ঘের ব্যবসায়ী ছিলেন। নিহতের স্বজনরা জানান, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে জিয়ালা উত্তরখোলা বিলে বিশ্বনাথ ঘোষের মাছের ঘেরে চুরি সন্দেহে তাকে আটক করা হয়। এরপর স্থানীয় বিশ্বনাথ ঘোষ, শিমুল ঘোষ, সমর ঘোষ, ইব্রাহিম খাঁ, হাবিবুর গাজী, গফফার শেখসহ ১০-১৫ জন তাকে জিয়ালা শ্মশান ঘাট এলাকায় নিয়ে গাছে বেঁধে হাত-পা ভেঙে দেয়, মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপায় এবং নির্যাতন চালায়। শুক্রবার সকালে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা ১২টার দিকে তার মৃত্যু হয়। তালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ঙঈ) মহসিন আলী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণের ব্যবস্থা করেছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পার বাধঘাটা গ্রামে মাদকাসক্ত ছেলের হাত থেকে মাকে বাঁচাতে গিয়ে চাচী খুন হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও দুজন। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহত সুধা রানী মন্ডল (৫৫) ওই গ্রামের মধুসূদন মন্ডলের স্ত্রী। ঘাতক রমেশ মন্ডলকে (৩০) স্থানীয় জনতা আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে। জানা যায়, মাদক কেনার জন্য টাকা না পেয়ে রমেশ তার মা কমলা রানীকে দা দিয়ে কোপাতে গেলে ডান হাতের কড়ে আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়। তাকে রক্ষায় এগিয়ে এলে দেবর পত্নী সুধা রানী ও ভাই সমীর কুমার মন্ডলকে রমেশ এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সুধা রানীকে মৃত বলে ঘোষণা করেন এবং গুরুতর আহত সমীরকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাফিউল ইসলাম পাটোয়ারী জানান, ঘাতক রমেশকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হচ্ছে।
এদিকে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে প্রতিপক্ষের দায়ের কোপে আহত মোজাম মিস্ত্রি (৬২) নামের এক ব্যক্তি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। গত শুক্রবার রাতে বাড়ি ফেরার পথে গোপালপুর এলাকায় তিনি প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হন। নিহতের পরিবারের দাবি, স্থানীয় প্রভাবশালী ইব্রাহিল হোসেনের গ্রেপ্তারের পেছনে মোজাম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে-এমন সন্দেহে ইব্রাহিলের ছেলে বিল্লাল হোসেন বাবু ও তার সহযোগীরা তাকে কুপিয়ে মৃত ভেবে খালের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। খুলনা ২৫০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়। শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ সাফিউল ইসলাম জানান, এ বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী জাকারিয়া হত্যা মামলার সব আসামিকে গ্রেপ্তার ও দ্রুত বিচারের মাধ্যমে ফাঁসির দাবিতে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেছে। সাতক্ষীরা সরকারি বালক বিদ্যালয়ের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, গত ২ অক্টোবর রাতে শহরের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে চায়ের দোকানদার বাপ্পি হাসানের সঙ্গে বিরোধের সময় তাকে বাঁচাতে গিয়ে জাকারিয়া ছুরিকাঘাতের শিকার হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নিহতের ভাইয়ের দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামিসহ চারজনকে পুলিশ ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে। মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে সকল আসামিকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।