অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়ার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়েছে বলে একাধিক সূত্রে দাবি করা হয়েছে। তবে সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেছেন, তিনি নিজেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর দাবি, তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং তাঁর কারণে সরকার ও দল বিব্রত হোক, তা তিনি চাননি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুর ২টার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক। তিনি জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-৬ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তাঁকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী তিনি দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
ইশরাক বলেন, গত দুই দিন ধরে একটি ঘটনা নিয়ে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতেই তিনি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন বলেও জানান তিনি।
ইশরাকের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীকে তিনি বলেছেন, তাঁর কারণে যেন সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড ম্লান না হয়। তাই তিনি পদত্যাগ করতে চান। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে সেই সুযোগ দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
তবে এর আগে রোববার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাককে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে কয়েকটি সূত্রে খবর প্রকাশিত হয়। সে সময় প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পদত্যাগের খবর অস্বীকার করে একে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করা হয়েছিল। সোমবার সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক নিজের সিদ্ধান্তকে স্বেচ্ছায় নেওয়া পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন।
‘আমাকে টার্গেট করা হয়েছে’
সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের সমালোচনা করে ইশরাক বলেন, দুই থেকে তিন দিন ধরে তাঁকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, প্রকাশিত খবরের কিছু অংশ সত্য হলেও কিছু বিষয় অতিরঞ্জিত করা হয়েছে এবং তাঁকে হেয় করতে কল্পকাহিনি তৈরি করা হয়েছে। এতে দল ও সরকার বিব্রত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাসা থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইশরাক বলেন, দল তাঁর পদত্যাগ চায়নি, তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশেষ কারণে তাঁকে পদ ছাড়তে হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়লেও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ইশরাক। তিনি বলেন, এখন থেকে সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন বিএনপি কর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে আরও বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করবেন। ঢাকা-৬ আসন ও আশপাশের এলাকায় মাদক নির্মূল এবং অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি। পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি জোরদার করা এবং বিভিন্ন জেলায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনার কথাও বলেন।
নিজের বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় গাড়ি থেকে প্রতিমন্ত্রীর মনোগ্রাম খুলে ফেলেন ইশরাক। পদত্যাগের সিদ্ধান্তের পরও মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান বদলাবে না বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান তিনি।
অস্ত্র হাতে অভিযানের ভিডিও ঘিরে বিতর্ক
ইশরাক হোসেনকে ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত শনিবার (১৭ অক্টোবর)। সেদিন রাজধানীর পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন তিনি। ওই সময় তাঁর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজনের হাতেও অস্ত্র ছিল বলে ভিডিওতে দেখা যায়।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। একজন প্রতিমন্ত্রীর এভাবে অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক তৈরি করে। রোববার দিনভর এ নিয়ে আলোচনা চলে এবং বিষয়টি সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
এরপর রোববার রাতে ইশরাকের পদত্যাগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। তবে তাঁর দপ্তর থেকে তখন তা অস্বীকার করা হয়েছিল। সোমবার সকালে নিজের যাচাইকৃত ফেসবুক পেজে দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা জানান তিনি। পরে সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে পদ ছাড়ার কথা জানান।
প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেও মাদকবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইশরাক। তবে গেন্ডারিয়ায় অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের পর তাঁর পদত্যাগ সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।