প্রার্থনার সুরে মিলছে সম্প্রীতির বার্তা, ৫৪ বছরের অনন্য নিদর্শন

এফএনএস (বরিশাল প্রতিবেদক) : | প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:২৯ পিএম
প্রার্থনার সুরে মিলছে সম্প্রীতির বার্তা, ৫৪ বছরের অনন্য নিদর্শন

একই মাঠে মসজিদ ও মন্দির। একপাশে আতরের সুঘ্রাণে নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা-অন্যপাশে ধূপকাঠিতে পূজা অর্চনা করছেন পূজারিরা। এ যেন প্রার্থনার সুরে মিলছে সম্প্রীতির বার্তা। এভাবেই দীর্ঘ ৫৪ বছরের অনন্য নিদর্শন হিসেবে ধর্মীয় সম্প্রীতির শিক্ষা ছড়িয়ে যাচ্ছে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের আধুনা এলাকার শেনেরহাট বাজার জামে মসজিদ ও সার্বজনীন দুর্গা মন্দির।

সরেজমিনে দেখা গেছে, একই মাঠের ১০ ফুট দূরত্বে মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও জাঁকজমকপূর্ণভাবে ওই স্থানে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিরোধতো দূরের কথা, স্থানীয় মুসলিম নর-নারীরা প্রতিবেশী হিন্দুদের পূজা উদযাপনে সহযোগিতা করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুই সম্প্রদায়ের আলাদা ধর্মীয় উপাসনালয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্যে প্রায় ৫৪ বছরের অধিক সময় ধরে চলছে ধর্মীয় অনুষ্ঠান। দুর্গাপূজার সময় মন্দির থেকে ভেসে আসে ঢাকঢোল, উলু, শঙ্খধ্বনি আর রাতভর হয় আরতি অনুষ্ঠান। তবে মসজিদে আজান শুরু হলেই নীরবতা বজায় রাখেন পূজারি ও ভক্তরা। নামাজ শেষ হলেই আবার শুরু হয় পূজার্চনা।

মন্দিরের পূজারি স্বপন ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, মসজিদে আজান শুরু হলেই আমরা পুরো অনুষ্ঠানের বিরতি দেই। নামাজ শেষে আবার আমাদের কার্যক্রম শুরু করি। আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ এ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এখানে কেউ কারো জন্য বিরক্তির কারণ হননি কখনোই। বরং দুই ধর্মের অনুসারীরা আগলে রেখেছেন তাদের এই পবিত্র দুটি স্থান। স্থানীয় সমাজ সেবক মাকসুদ মৃধা জানিয়েছেন, এখানে সবাই মিলেমিশে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করছেন। আমাদের পূর্বপুরুষরাও এমনটিই করেছেন। ছোটবেলা থেকেই আমরা পূজা দেখতে মণ্ডপে যাই। আবার ঈদে কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠানেও আমাদের অনুষ্ঠানে আসেন হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিবেশীরা। মন্দির কমিটির সভাপতি শংকর চন্দ্র দাস বলেন, ১৯৭২ সালে আধুনা শেনের বাড়ি সার্বজনীন দুর্গা মন্দির স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে একই মাঠে আধুনা জামে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। মন্দিরের মাত্র দশ ফুট দূরত্বে অবস্থিত জামে মসজিদে মুসলমান ধর্মের লোকজন তাদের ধর্ম পালন করে আসছেন। আমরা মন্দিরে আমাদের ধর্ম পালন করে আসছি। তিনি আরও বলেন, মসজিদ ও মন্দির পাশাপাশি হলেও আমাদের কোনো সমস্যা নেই। ৫৪ বছর ধরে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ এভাবেই ধরে রেখেছে তাদের সম্প্রীতির বন্ধন, সেই বন্ধন গড়ে তুলেছে ঐতিহ্য। চলছে মুসলিম-হিন্দু ধর্মীয় নানা কর্ম আর আনুষ্ঠানিকতা। এখানে কারো মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষের কোনো চিহ্ন নেই। আধুনা শেনের বাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা কামরুল ইসলাম বলেন, এখানে ধর্ম নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি নেই। মসজিদে আজান হলেই হিন্দু ভাইয়েরা ঢাক-ঢোলের আওয়াজ বন্ধ রাখেন। আজান ও নামাজ শেষ হলেই আবার তাদের কার্যক্রম শুরু করেন। বছরের পর বছর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্যদিয়ে এখানে যে যার ধর্ম পালন করেন। কেউ কারো প্রতি বিন্দুমাত্র বিরক্তির কারণ হননি কখনো। এ বিষয়ে গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইব্রাহীম বলেন, উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের আধুনা গ্রামের একইস্থানে মসজিদ ও মন্দির দীর্ঘ বছর ধরে ওই এলাকায় সম্প্রীতির শিক্ষা ছড়িয়ে যাচ্ছে। যা আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। 

তিনি আরও বলেন, আমরা এ ধরনের সমাজ ব্যবস্থাই চাচ্ছি। যেখানে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ মিলেমিশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে