হাড়ের ক্ষয়জনিত রোগ ঠেকাতে দেশজুড়ে স্ক্রিনিংয়ের আহ্বান জুবাইদা রহমানের

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:৩৮ পিএম
হাড়ের ক্ষয়জনিত রোগ ঠেকাতে দেশজুড়ে স্ক্রিনিংয়ের আহ্বান জুবাইদা রহমানের
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। হাড়ের ক্ষয়জনিত এই রোগ প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ ও আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে দেশের ৬৪ জেলায় সমন্বিত সচেতনতা ও স্ক্রিনিং কার্যক্রম চালুর আহ্বান জানিয়েছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বলেছেন, রোগটির প্রকৃত চিত্র জানতে আরও গবেষণা ও নিয়মিত পরীক্ষা প্রয়োজন। পাশাপাশি কন্যাশিশু ও তরুণীদের জন্য আগেভাগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল ভবনের কনভেনশন হলে বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ডা. জুবাইদা রহমান। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) ‘অস্টিওপোরোসিস: প্রতিরোধযোগ্য মহামারি’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে।

অস্টিওপোরোসিসকে নীরব রোগ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ রোগে হাড় দুর্বল, পাতলা ও ছিদ্রযুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে হঠাৎ বা সামান্য আঘাতেও হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা কমে যায়। অনেককে হাড় ভাঙার পর দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, বাংলাদেশে এ রোগে আক্রান্ত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা ধারণার চেয়েও বেশি হতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের সব অঞ্চলের মানুষের কাছে রোগ প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের একটি পরিসংখ্যানে বাংলাদেশে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়েছে। বয়স্কদের মধ্যে এ রোগে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

উত্তর-মধ্য বাংলাদেশের ৪৫ থেকে ৮০ বছর বয়সী নারীদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে ডা. জুবাইদা রহমান জানান, সেখানে অস্টিওপোরোসিসের প্রাদুর্ভাব ছিল ৪০ শতাংশ। অস্টিওপেনিয়ার হার ছিল ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৮৩ শতাংশের বেশি নারীর হাড়ের ঘনত্বে ঘাটতি পাওয়া যায়।

অস্টিওপেনিয়া হলো হাড়ের ঘনত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যাওয়ার এমন একটি অবস্থা, যা অস্টিওপোরোসিসের আগের পর্যায় হতে পারে। অন্যদিকে অস্টিওপোরোসিসে হাড় আরও দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

শহরাঞ্চলের ৪৬ থেকে ৬৫ বছর বয়সী নারীদের ওপর পরিচালিত একটি পুরোনো হাসপাতালভিত্তিক গবেষণাতেও একই ধরনের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে। ওই গবেষণায় অস্টিওপোরোসিসের প্রাদুর্ভাব পাওয়া যায় ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অস্টিওপেনিয়ার হার ছিল ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ।

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর নারীরা উন্নত দেশগুলোর নারীদের তুলনায় এ রোগে বেশি আক্রান্ত হন বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়। তবে বাংলাদেশে কতসংখ্যক নারী অস্টিওপোরোসিসে ভুগছেন, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নির্ধারণ করা কঠিন। এ কারণে রোগটির প্রকৃত বিস্তার বুঝতে আরও গবেষণা এবং নিয়মিত স্ক্রিনিং প্রয়োজন।

তিনি বলেন, কন্যাশিশু ও তরুণীদের জন্য যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে অস্টিওপোরোসিসের প্রকোপ ও এর জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে একটি অস্টিওপোরোসিস সোসাইটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন ডা. জুবাইদা রহমান। তাঁর মতে, এ ধরনের সংগঠনের মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলায় সমন্বিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা যাবে। কোনো অঞ্চলের মানুষ যেন সচেতনতা ও স্ক্রিনিংয়ের সুযোগের অভাবে রোগটির ব্যথা ও দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগে না ভোগেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। চিকিৎসক সমাজ রোগটির ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে।

দেশজুড়ে কর্মরত এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মীকেও এ কাজে যুক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি। তাঁদের মাধ্যমে রোগটির লক্ষণ, ঝুঁকি, প্রতিরোধ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

প্রতিবছর অস্টিওপোরোসিস সচেতনতা মাস পালনেরও আহ্বান জানান ডা. জুবাইদা রহমান। এ উপলক্ষে আলোচনা সভা, র‌্যালি ও জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযানের আয়োজন করা যেতে পারে। জেলা হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের জন্য আধুনিক রোগ নির্ণয় পদ্ধতিবিষয়ক সেমিনার আয়োজনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বলেন, ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি, হাড়ের খনিজ ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং শৈশবে ক্যালসিয়াম গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত পুষ্টিগত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।

এসব বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসা অঙ্গনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

হাড়ের খনিজ ঘনত্ব নির্ণয়ের জন্য স্ক্রিনিং ক্যাম্প আয়োজন এবং নির্দিষ্ট বিরতিতে কমিউনিটিভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ তৈরির আহ্বান জানান তিনি। যেসব এলাকায় হাড়ের খনিজ ঘনত্ব পরিমাপের ব্যবস্থা নেই, সেখানে ফ্র্যাকচার রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট টুল ব্যবহার করে হাড় ভাঙার ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রস্তাবও দেন।

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, অস্টিওপোরোসিসের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে দেশব্যাপী সমন্বিত উদ্যোগ, রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।

ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ড্যাবের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার এবং সংসদ সদস্য ডা. আব্দুস সালাম।

অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে প্রশ্নোত্তর পর্ব, প্যানেল আলোচনা ও কুইজ অনুষ্ঠিত হয়। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক ডা. এরফানুল হক সিদ্দিকী, অধ্যাপক ডা. ফারুক কাশেম, অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন, অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ, ডা. শেখ ফরিদ আহমেদ এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ বেলালুল ইসলাম।

‘আজীবন হাড় গড়ুন, সুরক্ষা দিন ও শক্তিশালী করুন’ প্রতিপাদ্যে এবারের কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এতে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা দিচ্ছে ইনসেপ্টা।

হাড়ের ক্ষয়জনিত রোগ অস্টিওপোরোসিস সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর ২০ অক্টোবর বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস পালন করা হয়। এ রোগে হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যাওয়ায় হাড় ভাঙার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে