সাড়ে ৬ বছরে সড়কে প্রাণ গেছে প্রায় ৮ হাজার শিশুর

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:০২ পিএম
সাড়ে ৬ বছরে সড়কে প্রাণ গেছে প্রায় ৮ হাজার শিশুর
ছবি: সংগৃহীত

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৭ হাজার ৯৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৯৫৮ শিশু প্রাণ হারিয়েছে মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে। পথচারী হিসেবে মারা গেছে ২ হাজার ৮১২ শিশু। সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা, অসচেতনতা এবং শিশুবান্ধব সড়কের অভাবকে এসব মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং সংস্থাটির নিজস্ব তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিহত শিশুদের ৩৭ দশমিক ১৪ শতাংশ মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী, ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশ পথচারী এবং ২৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী ছিল। মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে ২ হাজার ৯৫৮ শিশু, পথচারী হিসেবে ২ হাজার ৮১২ শিশু এবং বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে ২ হাজার ১৯৩ শিশু নিহত হয়েছে।

কিশোরদের মৃত্যুর সংখ্যা বেশি

বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারিয়েছে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুরা। এ বয়সের ৩ হাজার ৫৪৭ জন নিহত হয়েছে, যা মোট শিশুমৃত্যুর ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এ ছাড়া ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ২ হাজার ৮৮৪ এবং শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী ১ হাজার ৫৩২ শিশু প্রাণ হারিয়েছে।

গ্রামীণ সড়ক সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ

সড়কের ধরন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি শিশু নিহত হয়েছে গ্রামীণ সড়কে। এসব সড়কে ২ হাজার ৭১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা মোট প্রাণহানির ৩৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। আঞ্চলিক সড়কে ২ হাজার ৮২, মহাসড়কে ১ হাজার ৯৭৪ এবং শহরের সড়কে ১ হাজার ১৯৪ শিশু নিহত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামীণ সড়কগুলো অনেক ক্ষেত্রে বসতবাড়ির পাশ দিয়ে চলে গেছে। সেখানে শিশুদের চলাফেরা ও খেলাধুলার সময় যানবাহনের সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি। এসব সড়কে যানবাহন চলাচলের নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদারকির ঘাটতি এবং শিশুদের সড়ক ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে অসচেতনতাও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

পথচারী শিশুদের বড় অংশের মৃত্যু তিন চাকার যানে

পথচারী হিসেবে নিহত ২ হাজার ৮১২ শিশুর মধ্যে ১ হাজার ২৭১ জন তিন চাকার যানবাহনের ধাক্কা বা চাপায় মারা গেছে। এই সংখ্যা পথচারী হিসেবে নিহত শিশুর ৪৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। এসব যানবাহনের মধ্যে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, নসিমন ও ভটভটির মতো যান রয়েছে।

এ ছাড়া বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের মতো ভারী যানবাহনের ধাক্কা বা চাপায় ১ হাজার ১২৬ শিশু নিহত হয়েছে। প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের ধাক্কায় প্রাণ গেছে ৩১৭ শিশুর। মোটরসাইকেলের ধাক্কায় পথচারী হিসেবে নিহত হয়েছে আরও ৯৮ শিশু।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার পথেও প্রাণহানি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫১৩ শিশু নিহত হয়েছে। মোট শিশুমৃত্যুর ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ এ ধরনের দুর্ঘটনায় ঘটেছে। অন্যদিকে বসতবাড়ির আশপাশের সড়কে খেলাধুলার সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৯৬২ শিশু।

দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৬৩৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বিকেলে। সকালে নিহত হয়েছে ২ হাজার ১৬৮ শিশু এবং দুপুরে ১ হাজার ৮১৩ জন। এ ছাড়া রাতে ৫৯৮, সন্ধ্যায় ৫৪৬ এবং ভোরে ২০৪ শিশু প্রাণ হারিয়েছে।

শিশুদের সড়ক নিরাপত্তায় ছয় সুপারিশ

শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহত হওয়ার পেছনে ছয়টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এগুলো হলো, দেশের সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা শিশুবান্ধব না হওয়া, নিরাপদে সড়ক ব্যবহারের বিষয়ে শিশুদের সচেতনতার অভাব, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ না দেওয়া, অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের যানবাহন চালানো, আহত শিশুদের উপযুক্ত চিকিৎসার সংকট এবং চিকিৎসার ব্যয় বহনে পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা।

এসব সমস্যা সমাধানে ছয়টি সুপারিশও দিয়েছে সংস্থাটি। সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থাকে শিশুদের জন্য নিরাপদ করা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের যানবাহন চালানো বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার সুযোগ ও সক্ষমতা বাড়ানো, আহতদের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে বিশেষ সরকারি তহবিল গঠন এবং সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক ও পরিবহন খাতের অব্যবস্থাপনা এবং ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে শিশুরা উদ্বেগজনক হারে হতাহত হচ্ছে। প্রতিটি শিশুর মধ্যেই বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব শুধু পরিবার নয়, পুরো জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে