সরকারের ওপর ক্রমেই বড় হচ্ছে এলএনজি আমদানির আর্থিক চাপ। কিন্তু বিপরীতে দেশে কমছে গ্যাসের উৎপাদন। গত অর্থবছরে দেশে এলএনজি আমদানি বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে আগের তুলনায় কমেছে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদনও। বর্র্তমানে দেশে গ্যাসের মোট সরবরাহের প্রায় ৩৬ শতাংশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে এলএনজি। মূলত দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্রমহ্রাসমান উৎপাদন এবং নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানে ধীরগতির কারণে এলএনজির আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। বিগত ২০১৮ সার থেকে স্থানীয় গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে শুরু হয় এলএনজি আমদানি। জাতীয় গ্রিডে তখন সরবরাহকৃত গ্যাসে এলএনজির হিস্যা ছিলো ১১ শতাংশ। কিন্তু গত ৭ বছরের ব্যবধানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওই হার বেড়ে ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পেট্রোবাংলা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকারের ওপর এলএনজি আমদানির আর্থিক চাপ ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে। বিগত ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। আর আমদানীকৃত গ্যাস তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করতে একই সময়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৭৮ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ)। তার মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে ৯৬৫ বিসিএফ সরবরাহ করা হয়। বাকি ১১৩ বিসিএফ আমদানীকৃত এলএনজি থেকে আসে। যা মোট সরবরাহের প্রায় ১১ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ৯৮০ বিসিএফ (সাময়িক হিসাব)। তার মধ্যে স্থানীয় গ্যাসের পরিমাণ ৬২৮ বিসিএফ এবং এলএনজির পরিমাণ ৩৫২ বিসিএফ। অর্থাৎ ৭ বছরের ব্যবধানে স্থানীয় গ্যাসের সরবরাহ ৩৩৭ বিসিএফ কমেছে। বিপরীতে এলএনজির সরবরাহ ২৩৯ বিসিএফ বেড়েছে। বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহকৃত গ্যাসের প্রায় ৩৬ শতাংশ আমদানীকৃত এলএনজি। বাকি ৬৪ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে আসে। কিন্তু বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামের অস্থিরতা ও আমদানি ব্যয় বাড়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। আর আমদানীকৃত গ্যাসের সরবরাহ মূল্য সাশ্রয়ী রাখতে সরকারকে ভর্তুকিও দিতে হচ্ছে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে এলএনজি আমদানি বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে আগের তুলনায় কমেছে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন। দেশের গ্যাস সরবরাহে এ ধরনের পরিবর্তনের পেছনে দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান ঘাটতি ভূমিকা রেখেছে। গত দুই দশকে স্থলভাগে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বড় পরিসরের উদ্যোগ নেয়া যায়নি। একইভাবে এক দশকের বেশি সময় ধরে বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানও অগ্রগতি পায়নি। ফলে সীমিতই থেকেছে নতুন গ্যাসের মজুদ আবিষ্কার ও উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ। ফলে শিল্প, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের চাহিদা বজায় থাকায় ঘাটতি পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বিগত ২০১০-২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ১১২টি কূপ খননের তথ্য উল্লেখ করা হলেও ওই সময়ে নতুন করে খনন করা কূপের সংখ্যা ছিল ৩৮টি। তার মধ্যে প্রায় ১০টি ছিল অনুসন্ধান কূপ। বাকি কূপগুলোর অধিকাংশই মূল্যায়ন ও সংস্কারকাজে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে কূপ খননের মোট সংখ্যা দিয়ে নতুন গ্যাসের মজুদ আবিষ্কার কিংবা উৎপাদন বৃদ্ধির প্রকৃত অগ্রগতি বোঝা যায় না।
সূত্র আরো জানায়, বিগত ২০২২ সালে তৎকালীন সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে ৫০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলো। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরে নতুন করে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ওই কর্মসূচি বাস্তবায়নে আগামী ২০৩২ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।