ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় ইসলামী ফাউন্ডেশনের (ইফা) ফিল্ড সুপারভাইজার জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে কেন্দ্র পরিদর্শনের নামে শিক্ষকদের জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে অর্থ দাবি, চাকরিচ্যুতির ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ব্যাংক হিসাব লক করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকে কেন্দ্র করে উপজেলার কোরআন শিক্ষা প্রকল্পের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অভিযোগ, কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন অজুহাতে তাঁদের কাছে টাকা দাবি করা হয়। দাবি অনুযায়ী অর্থ না দিলে কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া, চাকুরি থেকে বাদ দেওয়া কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতায় ফেলার ভয় দেখানো হয়। কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, বেতন উত্তোলনের সময় তাঁদের ব্যাংক হিসাব লক করে দেওয়া হয় এবং পরে সেই সমস্যা সমাধানের বিনিময়ে অর্থ দাবি করা হয়। এ বিষয়ে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবরে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভূক্তভোগী আমিরাবাড়ী ইউনিয়নের গুজিয়াম কাচাচড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের শিক্ষক হাফেজ মো: শাহজাহান। তিনি উল্লেখ করেন, সহজ কোরআন শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক হিসেবে কেন্দ্র নীতিমালা অনুযায়ী সুনামের সাথে শিক্ষকতা করে আসছি। গত কয়েক মাস যাবত ইফার ফিল্ড সুপার ভাইজার জাহাঙ্গীর হোসেন স্যার অনৈতিক ভাবে মোটা অংকের টাকা দাবি করলে স্যারের অনৈতিক আবদার পূরণ করতে না পারায় তিনি দীর্ঘদিন যাবত আমার প্রতি ক্ষিপ্তভাবে আচরণ করে আসছেন। গত ৭ অক্টোবর বকেয়াসহ তিন মাসের সম্মানি ১৮ হাজার ৮শত টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করি। এসময় জাহাঙ্গীর হোসেন স্যার চাকরি খেয়ে ফেলার হুমকি ধমকি দিয়ে ব্যাংক থেকে উত্তোলন কৃত টাকা থেকে অনৈতিক ভাবে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। অনিচ্ছা থাকা সত্যেও চাকুরীর হারানোর ভয়ে অপারগ হয়ে তার হাতে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে বলে তিনি অভিযোগে উল্লেখ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে শিশুদের কোরআন শিক্ষা দিয়ে আসছি। অথচ কেন্দ্র পরিদর্শনের নামে আমাদের কাছে নিয়মিত টাকা দাবি করা হচ্ছে। ইসলামি ফাউন্ডেশনের মডেল কেয়ারটেকার আরিফের মাধ্যমে অর্থ দাবি করা হয়। আমরা নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চাই।’ টাকা দাবী করার বিষয়ে কথোপকথনের কল রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। হাফেজ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘বর্তমান সুপারভাইজার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শিক্ষকদের ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। আমার কাছেও টাকা দাবি করা হয়েছে। আমরা যে সামান্য সম্মানী পাই, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। সেখান থেকে যদি একটি বড় অংশ তাদের দিতে হয়, তাহলে সম্মান নিয়ে দায়িত্ব পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।’ বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে শিক্ষকদের হয়রানি বন্ধ করা হোক এবং কেউ যেন আর অনৈতিকভাবে অর্থ দাবি করতে না পারে, সেই ব্যবস্থা নেওয়ার বাদী জানান তিনি।’ত্রিশাল উপজেলার সানকিভাঙ্গা কেন্দ্রের শিক্ষক আব্দুল জব্বার অভিযোগ করে বলেন, একদিন সকাল ৮টা ৫১ মিনিটে সুপারভাইজার জাহাঙ্গীর হোসেন ও মডেল কেয়ারটেকার আরিফ তাঁর কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে আগেভাগে ছুটি দেওয়ার কারণ জানতে চান। তিনি জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হওয়ার কারণে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পাঠ শেষ করা হয়েছিল। এরপর তাঁকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে অফিসে যেতে বলা হয়। অফিসে যাওয়ার পর তাঁকে চাকুরি থাকবে না বলে ভয়ভীতি দেখানো হয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কয়েক দিন পর বেতন ব্যাংকে জমা হলেও ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে গেলে জানানো হয় তাঁর হিসাব লক রয়েছে। পরে অফিসে যোগাযোগ করলে প্রথমে ১৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। দর-কষাকষির একপর্যায়ে ১০ হাজার টাকায় বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। তিনি পাঁচ হাজার টাকার বেশি দিতে পারবেন না বলে জানান। তাঁর দাবি, শুধু তিনি নন, আরও অনেক শিক্ষক একইভাবে অর্থ দাবির শিকার হয়েছেন। আরেক শিক্ষক অভিযোগ করেন, ব্যাংক হিসাব লক করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অপরদিকে বিধবা ক্যাটাগড়িতে ইসলামি ফাউন্ডেশন থেকে বিতরণকৃত সেলাই মেশিন প্রাপ্ত এক বিধবা নারীকে দিনের পর দিন মোবাইল ফোনে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিল ইসলামী ফাউন্ডেশনের ভারপ্রাপ্ত কেয়ারটেকার ওমর ফারুক। বিষয়টি ওই বিধবা নারী পরিবারের লোকজনদের জানালে ওমর ফারুক কে নিয়ে সামাজিক সালিসের মাধ্যমে তাকে সাবধান করা হয়। এ বিষয়ে ত্রিশালের আলেম সমাজ মনে করেন, “ইসলামি ফাউন্ডেশনের মতো ধর্মীয় একটি সংস্থা কুরআন শিক্ষার শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ দাবি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ সত্য হলে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা উদ্ঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।”এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য ইসলামি ফাউন্ডেশনের ভারপ্রাপ্ত কেয়ারটেকার ওমর ফারুক তথ্য সংগ্রহকারী গণমাধ্যম কর্মীদের সরাসরি অর্থ বিনিময়ের অনুরোধ করেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী ফাউন্ডেশনের ফিল্ড সুপারভাইজার জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমি কোনো শিক্ষকের কাছে অনৈতিকভাবে অর্থ দাবি করিনি এবং কাউকে ভয়ভীতি প্রদর্শনও করিনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসনাত জাহান খান বলেন, ‘অভিযোগটি আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”