সরকারের সার নিয়োগ নীতিমালা লঙ্ঘন করে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় ‘ সার ডিলার’ নিয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগে বলা হয়, ডিলার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কালাইয়া ইউনিয়নের নাম না থাকার পরেও অন্য ইউনিয়নের জন্য আবেদনকারীকে কালাইয়া ইউয়িনে ডিলার নিয়োগ, নীতিমালা লঙ্ঘন করে একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে ডিলার নিয়োগ এবং নির্ধারিত শর্ত, গুদামঘরের পর্যাপ্ততা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে রাজনীতিক প্রভাব ও টাকার বিনিময়ে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি উপজেলা কমিটির সরেজমিন যাচাই বাছাই প্রতিবেদন জেলা কমিটি উপক্ষো করে পছন্দমত সুপারিশ তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি বিরুদ্ধে আর্থিক লেলদেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্তের দাবিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ এবং নীতিমালা লঙ্ঘন করে ডিলার নিয়োগ দেওয়ার বিচার চেয়ে আইনী নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, গত ৯ মার্চ সার ডিলার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জেলা প্রশাসক। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বাউফল উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়ন বাদে বাকি ১৪টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার নাম রয়েছে। এতে মোট ১০৮জন বিভিন্ন ইউয়িনের সারের ডিলারে জন্য জেলার কমিটির কাছে আবেদন করেন। উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির মাধ্যমে আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই বাছাই করা হয়। ক্রমানুসারে তিনজনের নাম সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠায় জেলা কমিটি। চলতি মাসের ১১ তারিখ ‘সার ডিলার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস’াপনা কমিটি’ জেলা কমিটির সুপারিশ ক্রম-১ অনুসারে অস’ায়ীভাবে সার ডিলার হিসেবে অনুমোদন দিয়ে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে তালিকা প্রকাশ করেন। অনুমোদিত ডিলারের নামের তালিকা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জড়িয়ে পড়লে শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা।
তালিকায় দেখা যায়, জেলা কমিটির সুপারিশ ক্রম-১ অনুযায়ী কালাইয়া ইউনিয়নে জলিল হাওলাদার নামে এক ব্যক্তিকে ডিলার অনুমোদন দেওয়া হয়। ডিলারশিপ পাওয়া জলিল উপজেলার ধুলিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। তিনি কালাইয়া ইউনিয়নের জন্য আবেদন করেনি। এমনকি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কালাইয়া ইউনিয়নের নামও ছিল না। তারপরেও তার নাম সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠায় জেলা কমিটি।
কালাইয়া ইউনিয়নের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ,‘ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী কালাইয়া ইউনিয়নের নাম ছিল না। তাই কালাইয়া ইউনিয়নের ডিলারশিপের জন্য কেউ আবেদন করেনি। তারপরেও টাকার বিনিময়ে ২৪ কিলোমিটার দূরের ধুলিয়া ইউনিয়নের জলিল হাওলাদারের নাম সুপারিশ করে জেলা কমিটি। মন্ত্রণালয় তাকে অনুমোদন দেয়। কালাইয়াতে তার কোনো গুদাম নেই, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই, সে কিভাবে কালাইয়া ইউনিয়নে সার ডিলার পরিচালনা করবেন। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে কৃষি মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন কেন্দ্রীয় কৃষকদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ মিজানুর রহমান। গত ১২ অক্টোবর তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে তিনি এ লিখিত অভিযোগ দেন। নীতিমালা লঙ্ঘন করে ডিলারশিপ নিয়োগ বাতিল দাবি করে কালাইয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা রিয়াজ হোসেন বলেন, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কালাইয়া ইউনিয়নের নাম না থাকায় আমরা অনেকে আবেদন করতে পারিনি। তারপরেও সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে ঘুসের বিনিময়ে ধুলিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি জলিল হাওলাদারের নাম সুপারিশ করেন জেলা কমিটি। এবিষয়ে কালাইয়া ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া জলিল হাওলাদার বলেন,‘ কালাইয়া ইউনিয়নের জন্য আবেদন করিনি, তা ঠিক। তবে জেলা কমিটি চাইলে দিতে পারেন বিধায় তারা দিয়েছেন।’ এদিকে, ২০২৬ সালের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী একই পরিবারের একাধিক সদস্য ডিলারশিপ পাবে না। নীতিমালা লঙ্ঘন করে কাছিপাড়া ইউনিয়নে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিকে ডিলার নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়, কাছিপাড়া ইউনিয়নে আবু রায়হান নামে যাকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে তার অপর দুই ভাই মো. শামীম ও কাওসার হোসেনেরও সারের ডিলার অনুমোদন রয়েছে।
নীতিমালা লঙ্ঘন করে দেওয়া ডিলারশিপ বাতিল ও আবেদন বঞ্চিত রাশেদুল ইসলামকে ডিলার নিয়োগ দেওয়ার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়, জেলা ও উপজেলা কমিটির কাছে আইনী নোটিশ পাঠানো হয়েছে। গত ১১ অক্টোবর উচ্চ আদালতের আইনজীবী আমেনা বেগমের মাধ্যমে এ আইনী নোটিশ পাঠায় রাশেদুল ইসলাম।
এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য না করে মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন আবু রায়হান। এছাড়াও, সার ডিলার নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত, গুদাম ঘরের পর্যাপ্ততা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে খোজ নিয়ে জানা যায়, বগা ইউনিয়নে সার ডিলার পায় নাজমা বেগম। তিনি কখনো সার ব্যবসা করেনি। এমনকি তার গুদামও নেই। একইভাবে মদনপুরা ইউনিয়নে রাহাত হোসেন, ধুলিয়া ইউনিয়নে জলিল চৌকিদার, বাউফল সদর ইউনিয়নে জামাল হোসেন, আদাবাড়িয়া ইউনিয়নে জসিম উদ্দিন ও কনকদিয়া ইউনিয়নে নিজামের বিরুদ্ধে নির্ধারিত শর্ত পূরণ, গুদামের পর্যাপ্ততা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা না থাকার পরেও ডিলারের জন্য সুপারিশ করে মন্ত্রাণলয়ে নাম পাঠানোর অভিযোগ উঠে জেলা কমিটির বিরুদ্ধে।
যদিও ডিলারশিপ পাওয়া ব্যক্তিরা দাবি করেন যথাযথ নিয়ম মেনে আবেদন করেছেন। যাচাই বাছাই শেষে তাদের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এবিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মো. মিলন বলেন, জেলা কমিটির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির প্রেক্ষিতে ১০৮ জন আবেদন করেন। পরে জেলার নির্ধারিত ছকে সরেজমিনে আবেদনকারীদের উপস্থিতিতে সঠিকভাবে যাচাই বাছাই করে জেলা কমিটির কাছে জমা দিয়েছে। এরপরের প্রক্রিয়া জেলা ও কেন্দ্রীয় কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। এ বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম বলেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। নীতিমালা মেনেই নাম সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। কেন্দ্রীয় কমিটি তা অনুমোদন দিয়েছেন। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি। সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে জেলা প্রশাসক ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি চৌধুরী আশরাফুল করিমের সরকারি ফোন নম্বরে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেনি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠালেও কোনো উত্তর দেয়নি।