তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরীর (২৮) ভাসমান মরদেহ উদ্ধারের স্থানটির কাছাকাছি থেকেই পাওয়া গেছে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেল। এদিকে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার আগে তার সঙ্গে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটানো জুনিয়র বন্ধু শাহরিয়ার দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীপের দেওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করছে তদন্ত সংস্থাটি।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকালে পিবিআই প্রধান মোস্তফা কামাল মোটরসাইকেল উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে।
একই দিন পিবিআই সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়, বৃহস্পতিবার রাতে শাহরিয়ার দীপকে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে দীপের অবস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তার দেওয়া বক্তব্য ও বিভিন্ন তথ্য সরেজমিনে যাচাই-বাছাই এবং বিশ্লেষণ করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসার তৃতীয় তলা থেকে দীপকে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজার ছেলে।
তাহসিফের মৃত্যুর আগে বাসার নিচে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা ও হাত মেলানোর একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামনে আসে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে ধারণ করা ওই ফুটেজে সবুজ পাঞ্জাবি পরা তাহসিফকে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে ও হাত মেলাতে দেখা যায়।
তাহসিফের পরিবারের সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে তার জুনিয়র বন্ধু শাহরিয়ার দীপ হিসেবে শনাক্ত করেন। ফুটেজে দেখা যায়, হাত মেলানোর পর তারা আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে সেখান থেকে চলে যান।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপের ডাকে সাড়া দিয়ে সেদিন বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। পরে দীপ জানিয়েছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা থাকায় তারা একটি ওয়ার্কশপে যান। মোটরসাইকেল মেরামতের পর একসঙ্গে খাবার খেয়ে সেখান থেকে চলে যান তারা। তবে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া ও মৃত্যুর ঘটনায় দীপের ভূমিকা কী, তা এখনো তদন্তাধীন।
এর আগে ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। পরে টঙ্গী নদী পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন। হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে মরদেহটি তাহসিফ সাউরীর বলে শনাক্ত করা হয়।
পরদিন বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাহসিফের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
তাহসিফের মৃত্যুর কারণ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি পুলিশ। তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিমের আশঙ্কা, ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গণমাধ্যমকে তিনি জানান, ২৭ অক্টোবর সারাদিন পরিবারের সদস্যদের জন্য কেনাকাটা করেছিলেন তাহসিফ। মাকে সঙ্গে নিয়ে বাবাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য কেনাকাটা করেন তিনি। সন্ধ্যার পর দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেননি।
তাহসিফের বাবা জানান, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে ছেলের কাছ থেকে ‘আম্মু আমি আসছি’ লেখা একটি বার্তা পেয়েছিলেন তারা। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে ভোর সোয়া ৫টার দিকে পুলিশের কাছ থেকে ছেলের মরদেহ উদ্ধারের খবর পান। তার ভাষ্য, রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় এর আগে কখনো যাননি তাহসিফ।
তাহসিফের চাকরিচ্যুতির বিষয়ে তার বাবা জানান, শৃঙ্খলাজনিত কারণে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়। ওই সময় আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকেও বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তাহসিফ।