চার দশকের অভিনয়জীবনে আড়াই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন বলিউডের প্রবীণ অভিনেতা পরেশ রাওয়াল। খলনায়ক, কৌতুক অভিনেতা কিংবা গুরুগম্ভীর চরিত্র, নানা ধরনের ভূমিকায় দর্শকের মন জয় করেছেন তিনি। কিন্তু নিজের অভিনীত এত ছবির মধ্যে মাত্র ১১টিকেই ভালো বলে মনে করেন এই অভিনেতা। সম্প্রতি মুম্বাইয়ের ১৪তম জাগরণ চলচ্চিত্র উৎসবে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে নিজের কাজের এমন মূল্যায়নের কথা জানান তিনি।
উৎসবে অনন্ত নারায়ণ মহাদেবন পরিচালিত ‘পাস্ট টেন্স’ ছবির প্রদর্শনী শেষে দর্শকদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন পরেশ রাওয়াল। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছেলে ও অভিনেতা আদিত্য রাওয়াল, তন্নিষ্ঠা চট্টোপাধ্যায়, শরিব হাশমি এবং পরিচালক অনন্ত নারায়ণ মহাদেবন।
আলোচনায় উপস্থাপক জানতে চান, দীর্ঘ অভিনয়জীবনে কতটি ছবিতে কাজ করেছেন, কখনো তার হিসাব রেখেছেন কি না। হেসে পরেশ জানান, ছবির সংখ্যা গুনে না রাখলেও নিজের ভালো কাজগুলোর কথা তাঁর মনে আছে। উপস্থাপক তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা প্রায় ২৫০ বলে উল্লেখ করলে অভিনেতা বলেন, সংখ্যাটি আরও বেশি হতে পারে। তবে এত ছবির মধ্যে নিজের পছন্দের সংখ্যা মাত্র ১১টি। তাঁর এই উত্তরে উপস্থিত দর্শকেরা অবাক হন। পাশে থাকা ছেলে আদিত্যও জানান, তাঁরা হিসাব করে দেখেছেন।
নিজের পছন্দের ছবির কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই ১৯৯৩ সালের ‘সরদার’-এর নাম উল্লেখ করেন পরেশ। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জীবনীভিত্তিক এই ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। ছবিটি তাঁর হৃদয়ের খুব কাছের। চরিত্রটির জন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছিল বলেও জানান অভিনেতা।
এরপর ১৯৯৭ সালের ‘তামান্না’র কথা বলেন তিনি। বাস্তব জীবনের টিকু নামের এক ব্যক্তির ঘটনা অবলম্বনে তৈরি ছবিটিতে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা ভালো হলেও পুরো ছবি নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না পরেশ। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধ তাঁর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বলে জানান।
তালিকায় রয়েছে দিবাকর বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ‘ওয়ে লাকি! লাকি ওয়ে!’ (২০০৮)। একই বছরের ‘মুম্বাই মেরি জান’ ছবিতেও নিজের চরিত্র নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন তিনি। এ ছাড়া উল্লেখ করেন ‘দ্য স্টোরিটেলার’ (২০২৫), ‘হেরা ফেরি’ (২০০০) এবং ‘ডাকাইত’ (১৯৮৭)-এর নাম। সত্যজিৎ রায়ের গল্প অবলম্বনে নির্মিত ‘দ্য স্টোরিটেলার’-এ কাজ করে বেশ আনন্দ পেয়েছিলেন বলে জানান পরেশ।
তবে পছন্দের ১১টি ছবির সব কটির নাম প্রকাশ করেননি তিনি। অভিনেতার ভাষ্য, সব নাম এখন মনে করে বলা সম্ভব নয়, তবে তাঁর অভিনীত ভালো ছবির সংখ্যা যে ১১টি, তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে হিন্দি সিনেমায় খলনায়কের চরিত্রে নিয়মিত অভিনয় করেছেন পরেশ রাওয়াল। তবে ওই সময়ের অনেক চরিত্রই তাঁর কাছে অযৌক্তিক ও হাস্যকর মনে হয়েছে। এমন চরিত্রের দৃশ্যগুলো উপভোগ্য করে তুলতে অভিনয়ের মধ্যে হাস্যরস যোগ করতে হতো বলে জানান তিনি।
পরেশ বলেন, “এ ধরনের অনেক চরিত্র করেছি। চরিত্রগুলো এতটাই বোকামিপূর্ণ ও হাস্যকর ছিল যে দৃশ্যগুলো উপভোগ্য করতে আমাদের সেগুলোতে হাস্যরস যোগ করতে হতো।”
তবে সব খলচরিত্র নিয়ে তাঁর অসন্তোষ নেই। নিজের পছন্দের খলচরিত্র হিসেবে ‘ডাকাইত’-এর কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, হিন্দি সিনেমায় খলনায়কের চরিত্র আরও বাস্তবসম্মত হওয়া দরকার। খলনায়ককে দেখেই যেন তাকে অপরাধী বলে মনে না হয়। বরং এমন একজন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত, যাকে বাসস্ট্যান্ড বা ট্যাক্সিস্ট্যান্ডেও দেখা যেতে পারে।
কৃত্রিম সাজপোশাক, দাড়ি-গোঁফ আর অতিরঞ্জিত আচরণ দিয়ে খলনায়ক তৈরির প্রবণতারও সমালোচনা করেন এই অভিনেতা। এমন চরিত্রে অভিনয় করতে তাঁর ভালো লাগত না বলেও জানান।
পরেশ রাওয়ালের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর একটি ‘হেরা ফেরি’ ছবির বাবুরাও গণপতরাও আপ্তে। ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটিতে অভিনয়ের পর চরিত্রটি দর্শকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পরে ‘ফির হেরা ফেরি’ ছবিতেও একই চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে।
জাগরণ চলচ্চিত্র উৎসবের প্রশ্নোত্তর পর্বেও উঠে আসে বাবুরাওয়ের প্রসঙ্গ। কয়েকজন দর্শক তাঁকে চরিত্রটির জনপ্রিয় সংলাপ শোনানোর অনুরোধ করেন। তবে সেই অনুরোধ না রেখে রসিকতা করে পরেশ বলেন, “না, না। ওটার জন্য টিকিট কাটতে হবে!” তাঁর জবাবে হাসিতে ফেটে পড়েন উপস্থিত দর্শকেরা।
‘পাস্ট টেন্স’ ছবির বিশেষ দিক হলো, এতে প্রথমবারের মতো বাবা ও ছেলে একসঙ্গে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন। পরেশ রাওয়ালের ছেলে আদিত্য রাওয়ালও ছবিতে অভিনয় করেছেন।
ছেলের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়ার পেছনে নিজের কোনো ভূমিকা ছিল না বলে জানান পরেশ। তাঁর মতে, পরিচালক অনন্ত নারায়ণ মহাদেবন নিজেই অভিনয়শিল্পী নির্বাচন করেছেন। বাবা-ছেলেকে একসঙ্গে নেওয়ার ক্ষেত্রে যেন বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ না ওঠে, সে বিষয়েও সতর্ক ছিলেন পরিচালক।
ছবির বিষয়বস্তু ভালো লাগায় অভিনয়ের প্রস্তাবে রাজি হন পরেশ। একই পরিচালকের ‘দ্য স্টোরিটেলার’ ছবিতে কাজের অভিজ্ঞতাও তাঁর ভালো ছিল।
আলোচনায় ভিন্নধর্মী ও শিল্পধর্মী ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ কম পাওয়ার আক্ষেপও জানান অভিনেতা। তাঁর অভিযোগ, বাণিজ্যিক ছবিতে পরিচিত মুখ হওয়ায় অনেক নির্মাতাই তাঁকে এ ধরনের ছবিতে নিতে চান না। তাঁদের ধারণা, তিনি হয়তো বেশি পারিশ্রমিক চাইবেন।
এ প্রসঙ্গে রসিকতা করে পরেশ বলেন, “তাঁরা ভাবেন, আমি ছবিটি করব ঠিকই, কিন্তু বেশি টাকা চাইব। আর আমার বেশি টাকা চাওয়াই উচিত!”
তবে ভালো চিত্রনাট্য ও উপযুক্ত চরিত্র পেলে এ ধরনের ছবিতে কাজ করার আগ্রহ রয়েছে তাঁর। সুযোগ কম পাওয়ার কারণে ভালো প্রস্তাব হাতছাড়া করতে চান না বলেও জানান তিনি।
১৯৮৪ সালে ‘হোলি’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় পরেশ রাওয়ালের। শুরুতে খলনায়ক হিসেবে পরিচিতি পেলেও পরে কৌতুক ও বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে নিজের অভিনয়দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি। ‘নাম’ (১৯৮৬), ‘কবজা’ (১৯৮৮) এবং ‘স্যার’ (১৯৯৩) ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে স্বীকৃতি পান।
‘স্যার’ ও ‘ওহ চোকরি’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন পরেশ। ‘হেরা ফেরি’র পাশাপাশি ‘হাঙ্গামা’, ‘গরম মসালা’, ‘চুপ চুপ কে’, ‘ভাগম ভাগ’ ও ‘ওয়েলকাম’-এর মতো কৌতুকধর্মী ছবিতেও অভিনয় করেছেন তিনি। ‘সরদার’, ‘ওএমজি: ওহ মাই গড!’ এবং ‘টেবিল নম্বর ২১’ ছবিতেও তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। অভিনয়ে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৪ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।