যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যের পাঠ্যবই পৌঁছানো নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। আসন্ন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য মোট ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই ছাপা হচ্ছে। কিন্তু ধীরগতিতে চলছে পাঠ্যবই ছাপা ও সরবরাহের কাজ। ১১৩টি প্রেসে প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপার কাজ চলছে। তার একই মালিকানায় একাধিক প্রেস রয়েছে। তার মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০ কপি, প্রাথমিক স্তরের ৭ কোটি ৯৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৩৮ কপি এবং মাধ্যমিক স্তরের ২২ কোটি ১০ লাখ ৪২ হাজার ৯২৩ কপি বই রয়েছে। ওসব বই ছাপাতে সরকারের প্রায় দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। তবে ইতিমধ্যে প্রাথমিকের ৫৪.৩৯ শতাংশ বই সরবরাহ করা হয়েছে। আর মাধ্যমিকে ওই হার মাত্র ২০ শতাংশ। কিন্তু বেশির ভাগ প্রেসই নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপার কাজ শুরু করেনি। এনসিটিবি এবং প্রেস সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রেসগুলো বই ছাপার ক্ষেত্রে চুক্তির তারিখ ৭০ দিন সময় পায়। সেজন্য প্রেসভেদে চুক্তির তারিখ অনুযায়ী কাজ শেষ করার সময়ও আলাদা হয়। তার প্রাথমিক স্তরের বইয়ের ৫০ শতাংশ কাজ ৯ অক্টোবরের মধ্যে এবং শতভাগ কাজ ৯ নভেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। আর মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের ৫০ শতাংশ কাজ শেষ করার সময়সীমা ৩ নভেম্বর এবং ৩ ডিসেম্বর শতভাগ কাজ শেষ করার সময়সীমা রয়েছে। কিন্তু বেশি পরিমাণ কাজ পাওয়া প্রেসগুলো ছাপার অগ্রগতিতে পিছিয়ে রয়েছে। ওই প্রেসগুলো কাজ শুরুর প্রথম ৪০ দিনের মধ্যে ৫০ শতাংশ বই সরবরাহের লক্ষ্য থাকলেও তারা তা পূরণ করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে যথাসময়ে পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি উদ্বিগ্ন।
সূত্র জানায়, বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপার ক্ষেত্রে কিছু প্রেসকে তাদের সক্ষমতার তুলনায় বেশি কাজ দেয়া হয়েছে। এনসিটিবি কাজের অগ্রগতি ও নির্ধারিত সময়ে ছাপা শেষ করার সক্ষমতা বিবেচনায় ২৬টি প্রেসকে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু ওসব প্রেসের কয়েকটির ক্ষেত্রে ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চিহ্নিত প্রেসগুলোর সঙ্গে এনসিটিবি আলাদা বৈঠক করেছে এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা চাওয়া হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো প্রেসের কাছ থেকে এ বিষয়ে লিখিত অঙ্গীকারও নেয়া হচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, ইতিমধ্যে প্রাথমিক স্তরের ৫৪.৩৯ শতাংশ বই সরবরাহ করা হয়েছে। তার মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকের ৮৬.২১ শতাংশ, প্রথম শ্রেণির ৭৭.৫৪ শতাংশ, দ্বিতীয় শ্রেণির ৭৫.৬২ শতাংশ, তৃতীয় শ্রেণির ৬৪.৯৪ শতাংশ, চতুর্থ শ্রেণির ৩৪.৬৯ শতাংশ এবং পঞ্চম শ্রেণির ২৭.২৪ শতাংশ বই সরবরাহ করা হয়েছে। আর ইবতেদায়ির বই সরবরাহের হার ৫৪.২২ শতাংশ। কিন্তু মাধ্যমিক স্তরে এখন পর্যন্ত ২০ শতাংশ বই সরবরাহ করা হয়েছে। তার মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির ৪৪.০৩ শতাংশ, সপ্তম শ্রেণির ২৭.৯৭ শতাংশ এবং অষ্টম শ্রেণির ৮.২৬ শতাংশ বই রয়েছে। কিন্তু এখনো শুরু হয়নি নবম-দশম শ্রেণির বই সরবরাহ। পরিস্থিতি উন্নয়নে বর্তমানে এনসিটিবি যে স্তরের বইয়ের কাজ দ্রুত শেষ করার প্রেসগুলোকে তাগিদ দিচ্ছে, প্রেসগুলো সেই কাজেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। নবম-দশম শ্রেণির বইয়ের কার্যাদেশ তুলনামূলকভাবে পরে হওয়ায় বেশির ভাগ প্রেস এখনো ওসব বই ছাপার কাজ শুরু করেনি। একাধিক পরিদর্শকদল প্রেসগুলোর কাজ তদারক করছে। কর্মকর্তারা নিয়মিত প্রেস পরিদর্শন করে বইয়ের মান যাচাইয়ের পাশাপাশি ছাপার অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিবেদন দিচ্ছে। আর ওসব প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রেসগুলোকে এনসিটিবি প্রয়োজনীয় তাগিদ দিচ্ছে।
এদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান জানান, পাঠ্যবই ছাপার ক্ষেত্রে কিছু মুদ্রণকারী ইচ্ছা করেই দেরি করছে। আবার কেউ সক্ষমতার অনেক বেশি কাজ পেয়েছে। এখন যদি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বই না যায় তাহলে শেষ সময়ে এনসিটিবি বই পৌঁছাতে বইয়ের মান যা-ই হোক তাই চাইবে। তখন নিম্নমানের কাগজে বই ছেপে প্রেসগুলো সরবরাহ করবে। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবিকে সতর্ক থাকতে হবে।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানান, ‘দু-চারজন দুষ্ট সব জায়গায়ই থাকে। এখানেও আছে। তবে সরকারের একাধিক সংস্থা ওসব প্রেস খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এনসিটিবির টিম নিয়মিত তদারকির কাজ করছে। তবে প্রাথমিকের বইয়ের কাজ আগে শেষ করতে বলায় মাধ্যমিকটা কিছুটা পিছিয়ে আছে। প্রাথমিকের কাজ শেষ হয়ে গেলে মাধ্যমিকের বইয়ের কাজ দ্রুত এগোবে। আশা করা যায় নির্দিষ্ট সময়েই বইয়ের কাজ শেষ করা যাবে।