বিদেশি ফল প্যাশন স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘আনারকলি’। এতোদিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় সীমিত পরিসরে এ ফলের চাষ হলেও এবার সোনারগাঁয়ের সমতল ভূমিতে শুরু হয়েছে এর বাণিজ্যিক চাষ। সোনারগাঁও পৌরসভার রাইজদিয়া গ্রামের দেলোয়ার ও নয়ন নামেদুই ভাই মিলে গড়ে তুলেছেন আনারকলির বাগান। অল্প বিনিয়োগে ভালো ফলন ও বাজারে চাহিদা থাকায় এ ফল চাষে ব্যপকসম্ভাবনা দেখছেন তারা।সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাইজদিয়া গ্রামের প্রায় দুই বিঘা জমিতে সারি সারি করে লাগানো হয়েছে আনারকলির চারা। বাঁশ ও তারের তৈরি মাচায় লতানো গাছগুলো ছড়িয়ে আছে। বেশ কিছু গাছে ঝুলছে কাঁচা ও পাকা ফল। বাগানের পরিচর্যা ও ফল সংগ্রহে ব্যস্ত ছিলেন উদ্যোক্তা দুই ভাই দেলোয়ার ও নয়ন। ফল দেখতে ও কিনতে স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থান থেকেও শৌখিন ক্রেতাদের বাগানে আসতে দেখা গেছে। তাদের দুই ভাইয়ের গড়ে তোলা বাগানে রয়েছে ১৮০টি আনারকলির চারা। চারা রোপণের পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ মাস পর গাছে ফলন আসতে শুরু করে। বর্তমানে বাগানে ভালো ফলন হচ্ছে বলে জানান তাঁরা। প্রতিটি আনারকলি ২০ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি সোনারগাঁয়ে অবস্থিত লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী ছাড়াও নিজেদের ফেসবুক পেজের মাধ্যমেও বিক্রি হচ্ছে এ ফল।আনারকলি ফলের এ বাগান করার পেছনে রয়েছে দুই ভাইয়ের পরিচিত একজন সফল বাগানীর দেখা একটি বাগানের গল্প। নয়নের এক আত্মীয় চট্টগ্রামে আনারকলির একটি বাগান দেখে এসে তাঁদের বিষয়টি জানান। পরে দুই ভাই নিজেরাই বাণিজ্যিকভাবে চাষের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা কক্সবাজারে থাকা এক বন্ধুর কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করে নিজ গ্রাম রাইজদিয়ার জমিতে শুরু করেন আনারকলির চাষ।দেলোয়ার হোসেন বলেন, সোনারগাঁয়ে এর আগে কেউ বাণিজ্যিকভাবে আনারকলি চাষ করেছে বলে আমাদের জানা নেই। আমড়া প্রথমবারের মতো চাষ শুরু করেছি। ফলনও খুব ভালো হয়েছে। বাজারে এই ফলের চাহিদাও আছে। নয়ন জানায়, কম পুঁজিতে ভালো একটা ব্যাবসা করা যায়, এমন চিন্তা থেকেই আনারকলি চাষ শুরু করি। ভালো মানের আনারকলি প্রতি কে.জি. ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে। তাই মনে হয়েছে, সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে পারলে এ ফল থেকে ভালো আয় করা সম্ভব। তবে বাগান তৈরির আগে উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন দেলোয়ার। পরে নিজেদের উদ্যোগেই চারা সংগ্রহ, জমি প্রস্তুত, গাছের পরিচর্যা ও ফল বিক্রির কাজ এগিয়ে নেন তারা দুই ভাই। এখন বাগানের পরিধি আরও বাড়াতে চান দেলোয়ার ও নয়ন। পাশাপাশি আনারকলির চারা উৎপাদন করে বিক্রির পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁদের। তারা চায় নিজেদের বাগানের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি অন্য উদ্যোক্তারাও এ ফল চাষে আগ্রহী করা।
রাইজদিয়া গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা সজীব বলেন, দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ের ফল আনারকলি এখন আমাদের এলাকাতেও চাষ হচ্ছে। টক-মিষ্টি স্বাদের কারণে ফলটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। রাইজদিয়া গ্রামে বানিজ্যিক ভাবে এর চাষ শুরু হওয়ায় স্থানীয় কৃষক ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন ধরনের ফল চাষে আগ্রহ তৈরি হবে বলে আশা করছি।
সোনারগাঁ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সাঈদ তারেক বলেন, আনারকলি দক্ষিণ আমেরিকার একটি সুস্বাদু ফল। আমাদের দেশেও এখন এর চাষ শুরু হয়েছে। এবার সোনারগাঁয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এর চাষ শুরু করা হয়েছে। কৃষি উদ্যোক্তা দেলোয়ার ও নয়ন দুই বিঘা জমিতে আনারকলি চাষ করেছেন। গাছের বৃদ্ধি ও ফলন বেশ ভালো দেখা যাচ্ছে। এ ফল চাষে খরচও তুলনামূলক কম। প্রতি বিঘায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ করে একজন কৃষক বছরে সাত থেকে আট লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। যেহেতু এটি উচ্চমূল্যের ও লাভজনক ফসল, তাই পর্যায়ক্রমে পুরো উপজেলায় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে আনারকলির চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এজন্য কৃষকদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে প্রযুক্তিটি ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে ।