রাজশাহী অঞ্চলেই সারের সংকট দেখা দিয়েছে। একই সাথে বাড়ানো হয়েছে সারের দাম। ডিলালদের কাছে গিয়ে চাহিদা মত সার পাচ্ছেন না কৃষকরা। অথচ দাম বেশি দিলেই খুচরা ব্যবসায়ীর দোকানে মিলছে সার। উপজেলা পর্যায়ে অধিকাংশ উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের ওই খুচরা ব্যবসায়ী দোকানে বেশি দেখা যায়। খুচরা ব্যবসায়ী ইচ্ছামত অতিরিক্ত দামে সার বিক্রয় করছেন। দেখার কেউ নেই। নেই কোন বাজার মনিটরিং। এতে কৃষকের এখন নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম। আমদানিকারকদের সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সারের এই কৃত্রিম সংকট বলে অভিযোগ করছেন ডিলার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
তিন দশক ধরে কৃষি খামার পরিচালনা করেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রিশিকুল ইউনিয়নের পলাশী গ্রামের আদর্শ কৃষক সাজেদুর রহমান। চলতি মৌসুমে ১২০ বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করেছিলেন তিনি। ন্যায্য দাম না পেয়ে তিনি আর্থিক লোকসানে পড়েছেন। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে একই জমিতে তিনি আমন আবাদের উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু এলাকার ডিলারদের কাছে তিনি সার পাচ্ছেন না। কালোবাজার থেকে চড়া দামে তাকে সার কিনতে হচ্ছে। এলাকার অধিকাংশ কৃষকের একই অভিযোগ কালোবাজার থেকে চড়া দামে সার কিনতে হচ্ছে।সাজেদুর রহমান জানান, ১ হাজার টাকার এক বস্তা ডিএপি সার কয়েকদিন আগে খুচরা দোকান থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকায় তিনি কিনেছেন। অথচ প্রতি মাসে রাজশাহীতে বিসিআইসি ও বিএডিসির ডিলারদের বিপুল পরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। ডিলারদের দোকানে সার মিলছে না। আশপাশের হাট-বাজারের খুচরা দোকানে সেই সার চড়া দামে পাওয়া যাচ্ছে। অনেকদিন ধরে রাজশাহীতে সারের কালোবাজারি চলছে। অভিযোগ করেও কোনো ফল পাওয়া যায় না। জানা গেছে, রাজশাহীতে মার্চের বরাদ্দ সার উত্তোলন ও বিক্রি হয়ে গেছে। তবে ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ-ডিলারের দোকানে গিয়ে তারা সার পাচ্ছেন না। আবার সেই সার আশ পাশের হাটবাজার রাস্তার মোড়ের খুচরা সার ও কীটনাশক দোকানে চড়া দামে পাওয়া যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এপ্রিলে ৮৯ জন বিসিআইসি ডিলারকে ১২৫ মেট্রিক টন এবং বিএডিসির ১২১ ডিলারকে ৪৮৩ মেট্রিক টন টিএসপি, বিসিআইসির ডিলারদের ৬৪৬ মেট্রিক টন ও বিএডিসি ডিলারদের ১ হাজার ২১৮ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ১ হাজার ১৭১ মেট্রিক টন এমওপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মার্চেও সমপরিমাণ টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়।
রাজশাহীর পবা, গোদাগাড়ী, তানোর, মোহনপুর, বাগামার, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, চারঘাট, বাঘা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিলারের দোকানে সার পাওয়া যাচ্ছে না। আমন ধানের চারা রোপণের আগে জমিতে বিঘা প্রতি ৩০ থেকে ৪০ কেজি করে ডিএপি সার দিতে হয়। কিন্তু গোদাগাড়ী ও তানোরে ডিলারের কাছে দুই সপ্তাহ ধরে টিএসপি ও ডিএপি সার পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় কৃষি অফিসে যোগাযোগ করেও সার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে কালোবাজার থেকে তারা সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
গোদাগাড়ীর পলাশী গ্রামের কৃষক আনোয়ার জানান, ডিএপি সারের সরকারি দাম প্রতি বস্তা ১ হাজার টাকা। কিন্তু ১ হাজার ৭৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় তা কিনতে হচ্ছে। তানোরের কৃষক শরিফুল ইসলাম জানান, গোদাগাড়ী ও তানোর এলাকার কৃষকরা সার কিনতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বেশি। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কেউ ফোন করলে ডিলাররা আবার ম্যানেজ করে দেন। অসাধু ডিলারদের সঙ্গে কৃষি কর্মকর্তারা যোগসাজশ করে শুধু কাগজে-কলমে সার উত্তোলন ও বিক্রি দেখাচ্ছেন।
রাজশাহীর চব্বিশ নগরীর এক কৃষক জানান, দামকুড়া হাটের সার ডিলার ইসলাম ট্রেডার্সে কখনোই সার পাওয়া যায় না। জেলা সার ডিলার সমিতির এক কর্মকর্তা বলেন, সমিতি থেকে ইসলাম ট্রেডার্সকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছে। সার তুলে কী করা হয় সেটা আমরা জানি না। ডিলারের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি ধরেননি। রাজশাহী জেলা শাখা বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম বলেন, উপজেলা সার বীজ মনিটরিং কমিটিতে ডিলারদের প্রতিবেদন দিতে হয়। সমিতি থেকে জেলা কমিটির কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। অভিযোগ পেলে পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এই মুহূর্তে রাজশাহীতে কোনো সার সংকট নেই বলে তিনি দাবি করেন।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, জেলায় এ সময়ে সারের কোনো সংকট নেই। চড়া দামে সার বিক্রির বিষয়েও তারা কোনো অভিযোগ পাননি। উপজেলা পর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত ডিলারের গুদাম মনিটরিং করছেন। কেউ বেশি দামে সার বিক্রি করছেন-এমন অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।