সুনামগঞ্জে হাওরে তলিয়ে গেছে ধান, কৃষকের আহাজারি

এফএনএস (একে কুদরত পাশা; দিরাই, সুনামগঞ্জ) :
| আপডেট: ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ০৭:০৪ পিএম | প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ০৭:০৪ পিএম
সুনামগঞ্জে হাওরে তলিয়ে গেছে ধান, কৃষকের আহাজারি

সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি এখন পানির নিচে। হাওরের পাশাপাশি নন-হাওর এলাকার ধানও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এতে সারা বছরের স্বপ্ন ভেঙে গেছে লাখো কৃষকের। চোখের সামনে ঘাম ঝরানো ফসল তলিয়ে যেতে দেখে কেউ বাকরুদ্ধ, আবার কারও চোখে শুধুই কান্না। জেলার ১২টি উপজেলার হাওরপাড়ের কৃষকরা চলতি বোরো মৌসুমে ধান ঘরে তোলা নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন। একদিকে তীব্র শ্রমিক সংকট, অন্যদিকে টানা বৃষ্টি, বজ্রপাত ও উজানের ঢল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বৃহস্পতিবার কিছুটা রোদের দেখা মিললেও নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাওরাঞ্চলে দুর্ভোগ কমেনি। কৃষাণীরা পাকা রাস্তা ও উঁচু স্থানে স্তুপ করে রাখা ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন। আর কৃষকরা নৌকা নিয়ে ডুবে যাওয়া ধান উদ্ধারে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন।

এ অবস্থায় শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় সুনামগঞ্জ জেলার সব বালুমহাল আরও পাঁচ দিনের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। এর আগে ২০ এপ্রিল থেকে ১০ দিনের জন্য বালুমহাল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) এস এম ইয়াসীর আরাফাত স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আগামী ৫ মে পর্যন্ত জেলার সব বালুমহালে বালু উত্তোলন ও পরিবহন বন্ধ থাকবে। জেলা প্রশাসনের মতে, বোরো ধান দেশের প্রধান খাদ্যশস্য হওয়ায় সময়মতো তা ঘরে তোলা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। তাই শ্রমিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং এ সময়ে সুরমা নদীর পানি ১৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ২২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে নদীর পানি বেড়েছিল ৫৬ সেন্টিমিটার। তবে গত সোমবার রাতের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। সেদিন মৌসুমের সর্বোচ্চ ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, ফলে হাওরের বিস্তীর্ণ বোরো ক্ষেত তলিয়ে যায়। সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, গত দুই দিনে বৃষ্টি কম থাকায় কিছুটা স্বস্তি মিললেও আবারও অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। ভারতের চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরামে বৃষ্টির কারণে উজানে ঢল নামছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাওরে ৯ হাজার ৫৭ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়েছে এবং ২ হাজার ৪৭ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে জলাবদ্ধতায় ৩ হাজার ২০০ হেক্টর ক্ষতির তথ্য দেওয়া হয়েছিল। তবে এ হিসাব প্রত্যাখ্যান করেছেন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় কৃষকরা। তাঁদের দাবি, বাস্তবে অর্ধেকেরও বেশি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওর ও সদর উপজেলার দেখার হাওর ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা ধান রক্ষায় নিরন্তর সংগ্রাম করছেন। কেউ পানির নিচ থেকে ধান তুলছেন, কেউ নৌকা বা ট্রলিতে করে উঁচু স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। জেলার প্রায় সব হাওরেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কৃষক নেতা আব্দুছ ছাত্তা বলেন, “আমার বাড়ি উঁচু এলাকায় হলেও সকাল থেকেই উপজেলার বিভিন্ন কৃষকের সঙ্গে দেখা করছি। যতটা সম্ভব ধান সংগ্রহ করতে তাদের উৎসাহিত করছি। কিন্তু কৃষকদের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়।”

দেখার হাওরের কৃষক আলী আমজদ বলেন, “আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। আমরা ছয় মাস কৃষিকাজ করি, আর এই ধানের আয় দিয়েই সারা বছর সংসার চালাই। ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা, বিয়ে-সবকিছুই এ ফসলের ওপর নির্ভরশীল। এখন কীভাবে আমাদের জীবন চলবে, তা আমরা জানি না। হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, “সুনামগঞ্জ এক ফসলনির্ভর এলাকা, তাই এই ধানই এখানকার মানুষের প্রধান আয়ের উৎস। এ ফসলকে নিরাপদ রাখতে রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে। ২০১৭ সালের পর মাটির বাঁধ নির্মাণের নামে হাওরাঞ্চলে শত কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। আমরা শুরু থেকেই হাওরের সব খাল ও নদী খননের দাবি জানিয়ে আসছি। আমাদের সেই দাবি বাস্তবায়ন করা হলে আজ কৃষকদের এমন ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়তে হতো না। আমরা আবারও সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি-হাওরের সব খাল ও নদী খনন করে এই অঞ্চলের কৃষকদের ফসলের স্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।”

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে