লক্ষ্ণীপুরের রামগতি উপজেলার নদী-খাল-বিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ জাল (যা চায়না রিং জাল নামেও পরিচিত)। সূক্ষ্ণ ফাঁসের এই জালের কারণে মেঘনা নদীসহ উপজেলার অভ্যন্তরীণ জলাশয়গুলোর বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মৎস্য সম্পদ চরম হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়া জীববৈচিত্র্য ধ্বংশে ভয়ানক ফাঁদিই হল চায়না দুয়ারি জাল। যাহা মাছ শিকারের জন্য হলেও তাতে আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে বহু জলজ প্রাণী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার আলেকজান্ডার, চর পোড়াগাছা, বড়খেরি, চররমিজ, চর গাজীসহ সব কয়টি ইউনিয়নের নদী সংলগ্ন খাল-বিল এবং মেঘনা নদীর জোয়ার-ভাটার এলাকাগুলোতে অসাধু জেলেরা শত শত চায়না দুয়ারি জাল পেতে রাখছে। এই জালের গঠন এমন যে, একবার মাছ প্রবেশ করলে তা আর বের হতে পারে না। ফলে রুই, কাতলা, মৃগেলের মতো বড় মাছের পোনা থেকে শুরু করে দেশীয় প্রজাতির টেংরা, পুঁটি, বাইন, শিং, মাগুর এবং বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় গুড়া মাছসহ কোনো কিছুই বাদ পড়ছে না। এমনকি জলাশয়ের শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া, সাপ, ব্যাঙ, কুঁচে ও অন্যান্য জলজ প্রাণিও এই জালে আটকে মারা যাচ্ছে।
স্থানীয় পেশাদার জেলেদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চায়না দুয়ারি জাল মাছ ধরার বিশেষ একটি ফাঁদ। যাহা লোহার গোল বা চার কোনা রিং আর নেট দিয়ে এই জাল তৈরি করা হয়। খুব ছোট ছোট ফাঁসওয়ালা জাল দিয়ে লোহার রিং ঘিরে দেওয়া হয়। জালটির ভেতরে মাছ ঢোকার অনেকগুলো দুয়ার বা পথ থাকে। এতে মাছসহ যে কোন জলজ প্রাণী একবার ঢুকে পড়লে জালের মুখ বন্ধ হয়ে যায়। বের হওয়ার কোন উপায় থাকে না। এর প্রস্থ দেড় থেকে দুই বর্গফুট ও ৪০ থেকে ৫০ ফুট লম্বা। এতে করে কম পরিশ্রমে বেশি মাছ শিকার করা যায়। অনেকগুলো দুয়ার থাকার কারণে এটাকে চায়না দুয়ারি জাল বলে। আবার কেউ কেউ এটাকে রিং জালও বলে তাকে। এটি কারেন্ট জালের চেয়েও বিপদজনক জাল। সূক্ষ্ণ এই জালের ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে অনতিবিলম্বে এই উপজেলায় দেশীয় প্রজাতির মাছের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। চায়না দুয়ারি জালের এই ভয়াবহ থাবায় ইতিমধ্যেই প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলা মৎস্য দপ্তর সূত্রে জানা যায়, অবৈধ জাল দিয়ে মাছ ধরা এবং বিপনন বন্ধে মৎস্য বিভাগ ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড যৌথভাবে নিয়মিত অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আসছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন খাল বিলে অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ অবৈধ বেশ কিছু বেহুন্দী জাল, লোতা জাল উদ্ধার করা হয়। এসময় বিভিন্ন বাজারের দোকানে অভিযান করে ৮৫০ টি চায়না দুয়ারি (রিং জাল) জব্দ করা হয়। যার আনুমানিক মুল্য প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। পরে এসব জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সৌরভ-উজ-জামান জানান, চায়না দুয়ারি জাল একটি সম্পূর্ণ অবৈধ এবং ধ্বংসাত্মক জাল। এর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে বেশ কিছু জায়গায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে শত শত মিটার জাল জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে। মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করণ এবং খালে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে সচেতনতার অভাব এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের গোপন বিক্রির কারণে এর ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।