বাংলাদেশের নদীগুলো একসময় ছিল জীবনের উৎস, কৃষি, পরিবহন ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু আজ সেগুলো দূষণে জর্জরিত। শিল্পকারখানার বর্জ্য, অপরিশোধিত পয়ঃনিষ্কাশন, প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে নির্বিচারে। ফলে নদীর পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে, মাছ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে, আর নদী তীরবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা বিপন্ন হচ্ছে। নদী দূষণ শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি। দূষিত পানি কৃষিতে ব্যবহার করলে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়, খাদ্যে বিষাক্ত উপাদান প্রবেশ করে। পানীয় জলের সংকট বাড়ে, জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। নদীভিত্তিক অর্থনীতি যেমন মৎস্য, নৌপরিবহন ও পর্যটনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত হলে ভাঙন ও বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা আরও অনিশ্চিত করে তোলে। আমরা মনে করি, নদী দূষণ রোধে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। প্রথমত, শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি শিল্পকারখানায় কার্যকর ইটিপি (ঊভভষঁবহঃ ঞৎবধঃসবহঃ চষধহঃ) বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং নিয়মিত মনিটরিং চালাতে হবে। দ্বিতীয়ত, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে, যাতে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে না যায়। তৃতীয়ত, প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে নদী দখল ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। নদীকে তার প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে দিতে হবে। স্থানীয় জনগণকে সচেতন করতে হবে, যাতে তারা নদীতে বর্জ্য না ফেলে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে নদী রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নদী রক্ষায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক কঠোরতা। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। নদী দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নদী ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকার, পরিবেশ অধিদপ্তর ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নদী আমাদের জীবনরেখা। দূষণ রোধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে আগামী প্রজন্মকে আমরা একটি মৃত নদীর দেশ দিয়ে যাব। এখনই সময় নদী রক্ষায় দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার, যাতে পরিবেশ, অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য একসঙ্গে সুরক্ষিত থাকে।