প্রতিদিন সকালে পত্রিকা খুললেই কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই নজরে পড়ে অবুঝ কোনো শিশুর ছবি, মোবাইল নম্বর আর আকুল আবেদন-‘সন্ধান দিন, শিশুটি নিখোঁজ।’ গত সাত মাসে দেশজুড়ে প্রায় ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর সামনে এসেছে। প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো প্রান্ত থেকে শিশু হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হচ্ছে। কিন্তু এই নিখোঁজের মিছিল থামছেই না। এত শিশু কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে, কেনই বা এই অবোধ শিশুরা এভাবে উধাও হয়ে যাচ্ছে-তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও সমাজসেবীদের মনে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ ও নানা প্রশ্ন। কোথায় যাচ্ছে এসব হারিয়ে যাওয়া শিশু? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মানবাধিকার সংগঠন ও সমাজসেবীদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে শিশুদের হারিয়ে যাওয়া ও নিখোঁজ থাকার পেছনে বেশ কিছু প্রধান কারণ। নিখোঁজ শিশুদের বড় একটি অংশ পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে। এদের দেশের বাইরে কিংবা দেশের ভেতরেই নানা অপকর্মে ব্যবহারের জন্য পাচার করা হয়। বড় শহরগুলোতে পথশিশু এবং ঘরছাড়াদের লক্ষ্য বানিয়ে একশ্রেণীর অসাধু চক্র জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তি, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম কিংবা অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে ফেলে। সমাজ বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু নিখোঁজের ঘটনা শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা জনিত সমস্যা নয়, এটি একটি বড় ধরনের সামাজিক সংকট। অভিভাবকদের অসচেতনতা, সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার এবং পাচারকারী চক্রগুলোর তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হচ্ছে। জিডি করার পর অনেক শিশুর হদিস মিললেও একটি বড় অংশ থেকে যায় অনুসন্ধানের বাইরে। জনসাধারণের প্রশ্ন-এই আতঙ্কিত পরিস্থিতির শেষ কোথায়? আর কবে কমবে এই নিখোঁজের হার? এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। নিখোঁজের খবর পাওয়ামাত্রই জিডি নথিভুক্ত করে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে দ্রুত অনুসন্ধানে নামতে হবে। আন্তঃজেলা পাচারকারী চক্রগুলোকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পিতা-মাতা সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তারা ইন্টারনেটে কী করছে এবং কাদের সাথে মিশছে সে বিষয়ে অভিভাবকীয় নজরদারি বজায় রাখতে হবে। পুলিশের সামপ্রতিক তথ্যেও শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে পথ হারানো, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা এবং একা চলাচলের সময় অন্যত্র চলে যাওয়ার মতো কারণের কথা বলা হয়েছে। এই বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে তাই শুধু অপরাধের আশঙ্কা নয়, শিশুর পরিচর্যা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।