মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে প্রাণহানী ও পঙ্গুত্বের সংখ্যা

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে প্রাণহানী ও পঙ্গুত্বের সংখ্যা
ছবি: সংগ্রহীত

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে প্রাণহানী ও পঙ্গুত্বের সংখ্যা। যানজট এড়িয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো, তুলনামূলক কম খরচে যাতায়াত এবং রাইড শেয়ারিংয়ের কারণে দেশে বেড়েছে মোটরসাইকেলের ব্যবহার। আর ওই বাহনের বিস্তারের সাথে পাল্লা দিয়ে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন অমান্য, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা এবং ভারী যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রতিনিয়ত সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটছে। বিগত ২০২৫ সালে দেশে ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২ হাজার ৬৭১ জন। ওই বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহতের ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়। আর ২০২৪ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬০৯ জন নিহত হয়। তাছাড়া ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সাড়ে ৬ বছরে দেশে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। ওসব দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ১৪৩ জন আহত হয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন  সংস্থা এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সড়কে নিয়ন্ত্রণে হারানোর কারণেই সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং ভারী যানবাহনের ধাক্কায়ও দুর্ঘটনা ঘটছে। বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের বড় অংশই মোটরসাইকেল। বিআরটিএ’র হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে নিবন্ধিত মোটরযানের সংখ্যা ৬৮ লাখ ৪৩ হাজার ৪০৪টি। তার মধ্যে মোটরসাইকেল ৫০ লাখ ৮০ হাজার ৮৬৮টি। ওই বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেল সড়কে চলাচল করলেও ওই অনুপাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। ফলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের তরুণ প্রজন্ম। কারণ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের বড় অংশই তরুণ।  দুর্ঘটনাসংক্রান্ত বিশ্লেষণে দেখা যায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তরুণদের মধ্যে দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালানো, ঝুঁকি নিয়ে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম করা, ট্রাফিক সংকেত উপেক্ষা করা এবং পর্যাপ্ত দক্ষতা অর্জনের আগেই মহাসড়কে চলাচলের প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় শিশু নিহতের ঘটনাও উদ্বেগজনক। বিগত ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু নিহত হয়েছে। তার মধ্যে মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে ৩৭ দশমিক ১৪ শতাংশ শিশু। আর নিহত শিশুদের মধ্যে ৩ হাজার ৫৪৭ জনের বয়স ১৩ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে, ২ হাজার ৮৮৪ জনের বয়স ৬ থেকে ১২ বছর এবং ১ হাজার ৫৩২ জনের বয়স শূন্য থেকে ৫ বছর। 

সূত্র জানায়, সড়ক-মহাসড়কে ভারী যানবাহনের ধাক্কায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির অন্যতম বড় কারণ। ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা বাসের সঙ্গে সংঘর্ষ হলে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের গুরুতর আহত কিংবা নিহত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। মোটরসাইকেলে চালক ও যাত্রীদের ঘিরে কোনো সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকায় সামান্য ধাক্কায়ও চালক বা আরোহী ছিটকে সড়কে পড়ে। তখন ভারী যানবাহনের চাকায় পিষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি আঞ্চলিক সড়কে ঘটে। যদিও মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হলেও দেশে হেলমেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে নানা ঘাটতি রয়েছে। অনেক চালকই মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করে না। আবার কোথাও চালক হেলমেট পরলেও পেছনের আরোহীর মাথায় খুবই নিম্নমানের হেলমেট থাকে। 

সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশে মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশ মোটরসাইকেলের মাধ্যমে ঘটে। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি। বিশেষ করে মানসম্মত হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, লাইসেন্সবিহীন চালক এবং বেপরোয়া গতির বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশকে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তাছাড়া শহরের ভেতরে ও মহাসড়কে মোটরসাইকেলের গতিসীমা নির্দিষ্ট করা এবং সিসিটিভি ও স্পিড গানের মাধ্যমে তা নিয়মিত মনিটর করা, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা, চালক এবং আরোহীদের জন্যই সার্টিফাইড ও মানসম্মত ফুল-ফেস হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করাও জরুরি। কারণ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় অর্ধেকের বেশি মৃত্যু ঘটে মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণে। পাশাপাশি দেশে সহজলভ্য, নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব উন্নত গণপরিবহন চালু করা হলে মানুষ মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরতা কমে পরোক্ষভাবে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনবে। 

এদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ জানান, দেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে মোটরসাইকেলের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীকে শুধু হেলমেট পরলেই হবে না, সেটি মানসম্মত কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাজার ও সড়কে অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত হেলমেটের ব্যবহার দেখা যায় না। বর্তমান আইনে হেলমেট পরার কথা থাকলেও কী ধরনের হেলমেট ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত মানদণ্ড স্পষ্ট করার প্রয়োজন।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, মোটরসাইকেল আমদানি ও বিক্রি অব্যাহত রেখে অভিযান চালিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সরকার মোটরসাইকেল থেকে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়। কিন্তু ওই রাজস্বের বিপরীতে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসহ অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় কত টাকা ব্যয় হচ্ছে তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব সরকারের কাছে নেই। মোটরসাইকেলের কারণে দেশের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য খাতে কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, তা নিরূপণে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে