গ্রীষ্মের দাবদাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজধানীর তুলনায় দেশের মফস্বল ও গ্রামগুলোতে বিদ্যুতের হাহাকার সবচেয়ে বেশি। কোথাও কোথাও দিনে ও রাতে মিলিয়ে ৭ থেকে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না বলে জানা গেছে। জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটির কারণে সামনের দিনগুলোতে এই পরিস্থিতি আরও অবনতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্ব এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে এই সংকট শুধু বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ সংকট মূলত আমদানিনির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দেশের চাহিদার একটি বড় অংশ মেটাতে হয় আমদানিকৃত এলএনজি এবং কয়লার মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখনই এসব জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পায় কিংবা ডলারের সংকট প্রকট হয়, তখনই দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো জ্বালানি সংকটে পড়ে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণভাবে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে গত কয়েক দশকে প্রত্যাশিত গতি না আসা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগছে শিল্প কারখানায়। গ্যাসের ঘাটতি ও বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আশঙ্কা। চাহিদার সর্বোচ্চ সময় অর্থাৎ পিক আওয়ারে দুই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায়, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। পাওয়ার সেলের তথ্য মতে, ক্যাপটিভসহ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩২ হাজার ৩২২ মেগাওয়াট। গ্রাহক সংখ্যা ৪ কোটি ৯৬ লাখ। তবে এখন জাতীয় সঞ্চালন লাইনে প্রতিদিন যোগ হচ্ছে মাত্র ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন মূলত গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বৈশ্বিক যেকোনো অস্থিরতায় দেশের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন ৯০০ থেকে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যা দিয়ে দিনে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এক অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গ্যাস সরবরাহ যদি ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে আসে, তবে উৎপাদন সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে যেতে পারে। এই সংকট থেকে উত্তরণ কোনো সাময়িক পদক্ষেপ বা জোড়াতালি দেওয়া সিদ্ধান্তে সম্ভব নয়। দেশে বরাবরই চুরি-লুণ্ঠনের বড় খাত জ্বালানি খাত। এ খাতে দীর্ঘদিনের চুরি- লুণ্ঠনের খেসারত জাতিকে দিতে হয়, হচ্ছে। আর পরিস্থিতি সামলানো হয় জোড়াতালি বা এডহকে। সিস্টেম লসের নামে যে অপচয় হয় এবং অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে যে লুণ্ঠন চলে, তা কঠোর হাতে দমন হলে অবস্থা এ পর্যায়ে যায় না। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়।