কালীগঞ্জের সাতগাছিয়া মসজিদ ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে

এফএনএস (টিপু সুলতান; কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ) : | প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম
কালীগঞ্জের সাতগাছিয়া মসজিদ ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে

মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর অনেক নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। এমনি একটি দর্শনীয় স্থান ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের। কালের বিবর্তনে টিকে থাকার পাশাপাশি গৌরব ভরে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। সাতগাছিয়া আদিনা মসজিদ বা সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদ ও প্রত্নতাত্তিক স্থাপনা গুলোর মধ্যে অন্যতম।সম্ভবত পনেরো শতকের শেষভাগে নির্মিত বা মুগলপূর্ব যুগের এ মসজিদটি ১৯৭৮ সালের প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে সাতগাছিয়ার গ্রামবাসির সামনে উন্মোচিত হয়। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলে প্রত্ন্নতাত্তিক খননকার্য চলে এবং বর্তমানে সাতগাছিয়া মসজিদটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের অধীনে একটি সংরক্ষিত ইমারত।আয়তাকার সাতগাছিয়া মসজিদটির প্রতি দেওয়ালের পুরুত্ব ১.৫ মিটার এবং দেওয়ালের প্রতি বাহুর দৈর্ঘ্য উত্তর-দক্ষিণে ২৪.২৫ মি. ও পূর্ব-পশ্চিমে ১৮.৫৫ মিটার। মসজিদের পূর্বদিকে ছিল ৭টি খিলান বিশিষ্ট প্রবেশদার। এ ছাড়াও দক্ষিণে ছিল ৫টি, উত্তরে ছিল ৩ টি প্রবেশদ্বার ও ২টি কুলুঙ্গি এবং পশ্চিমদিকে ছিল একটি বন্ধ প্রবেশদ্বার। মসজিদের মূল ইমারতটি ৩৫ গম্বুজ বিশিষ্ট ছিল বলে প্রতয়িমান হয়। প্রার্থনা কক্ষটি ৭টি আইল ও পাঁচটি বেতে বিভক্ত এবং ৬ সারিতে মোট চারটি করে ২৪টি নিরাবলম্ব স্তর্ভে বিন্যাস্ত। চারকোণের চারটি স্তম্ভ ছিল গোলাকার টারেটে আচ্ছাদিত। ৩৫ গম্বুজ বিশিষ্ট সাতগাছিয়া মসজিদটির সঙ্গে ষাটগম্বুজ মসজিদের সাদৃশ্য বিদ্যমান।মসজিদের সাতটি মিহরাবের মধ্যে চারটির পর্যন্ত আবিষ্কৃত গয়েছে এবং এগুলি শেকল ও ঘন্টা, সূর্যমুখী ফুল, গোলাপ প্রকৃতির সমৃদ্ধ নকশা দ্বারা অলংকৃত। কেন্দ্রীয় মিহরাবের উত্তর দিকে একটি বন্ধ প্রবেশদ্বার রয়েছে। এটি ষাটগম্বুজ মসজিদের প্রবেশদ্বারের সঙ্গে খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ।

সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদটি কালীগঞ্জ উপজেলার কাষ্ঠভাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের অন্তর্গত সাতগাছিয়া গ্রাম ও ১৫১ সাতগাছিয়া মৌজার ৯১ নং দাগে অবস্থিত। স্থানীয় ভাবে মসজিদটি আদিনা মসজিদ নামেও পরিচিত। আদিনা অর্থ শুক্রবার।মধ্যবর্তী চৌচালা গুলো বাদ দিলে বাগেরহাটের ষাইট গম্বুজ মসজিদের একটি বাহুর সঙ্গে সাতগাছিয়া মসজিদের ভূমি-নকশার তুলনা করা যায়। সাতগাছিয়া মসজিদের কেন্দ্রীয় মিহরাবের উত্তর পার্শ্বস্থ প্রবেশ-পথের সঙ্গে ষাইট গম্বুজ মসজিদের অনুরূপ প্রবেশ-পথের সাদৃশ্য রয়েছে। এ মসজিদের উত্তর পার্শ্বে একটি সড়ক ও বর্গাকার একটি দিঘি রয়েছে। মসজিদটির নামানুসারে দিঘিটিও আদিনা দিঘি নামে পরিচিত। মসজিদের পুব দিকের জমি কিছুটা উঁচু ও দক্ষিণ দিকের জমি কিছুটা নিচু দেখা যায়। স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যের কারণে মসজিদটি পনেরো শতকের প্রথমার্ধে নির্মিত বলে ধারণা করা যায়। এ মসজিদে পোড়ামাটির বিভিন্ন প্রকার অলঙ্করণ রয়েছে। স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এ মসজিদটিকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন মসজিদ হিসেবে গণ্য করা যায়। নিম্নমানের কাজ ও কারিগরি দক্ষতার অভাবের কারণে মসজিটি ধ্বংস হয়ে যায়।১৯৮৩ সালে স্থানীয় জনগণ বিরাট আকারের ঢিবির কিছু অংশ খনন করে। খননের ফলে ১৬টি থাম ও পোড়ামাটির নকশাসহ ৫টি মেহরাব বিশিষ্ট এই মসজিদ আবিষ্কার করে। পরে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর ১৯৯০ সালে খনন করে ৩৫ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির ধংসাবশেষের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। মসজিদটি খান জাহান আলী নির্মিত ষাট গম্বুজ মসজিদ ও তুঘলকি স্থাপত্যশৈলী অনুরূপ। ধারণা করা হয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে খান জাহান আলী তার অনুচরদের নিয়েইসলাম ধর্ম প্রচার করতে বাংলায় আসেন। সেই সময়ে তার কোন অনুচর কর্তৃক এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে মাটি চাপা পরে।