দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ সংকটে ধুঁকে ধুঁকে চলছে রাজশাহীর কমিউনিটি ক্লিনিক গুলো। চিকিৎসা নিতে আসা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এসকল চিকিৎসাকেন্দ্র। প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায় কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে রোগীদের।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ইউনিয়ন পর্যায়ে গড়ে তোলা হয়েছিল কমিউনিটি ক্লিনিক। স্বল্প খরচে চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার সুযোগ থাকায় গ্রামীণ মানুষের কাছে এসব ক্লিনিক দীর্ঘদিন ধরে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।তবে গত প্রায় পাঁচ মাস ধরে ওষুধ সংকটে রাজশাহীর অধিকাংশ কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা। অনেকেই ক্লিনিকে এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন, আবার অনেককে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে বাড়তি খরচে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। যদিও চিকিৎসকেরা রোগ অনুযায়ী ব্যবস্থাপত্র লিখে দিচ্ছেন।রাজশাহী জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় ২৩৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এসব কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ওষুধ পেতেন গ্রামের সাধারণ মানুষ। পাঁচ মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ না থাকায় চরম সমস্যায় পড়েছেন গ্রামের গরিব ও সাধারণ মানুষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগে সরকারিভাবে জ্বর, সর্দি, কাশি, মাথাব্যথা, পাতলা পায়খানাসহ বিভিন্ন সাধারণ রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ২৭ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হতো কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে। বর্তমানে জ্বর, ডায়রিয়া, হাঁচি-কাশি ও অ্যান্টিবায়োটিকসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। কাগজে-কলমে এখন ২২ ধরনের ওষুধ সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে সেই সরবরাহও অনিয়মিত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপিরা জানান, সর্বশেষ গত বছরের আগস্ট মাসে অধিকাংশ ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছিল। তখন যে পরিমাণ ওষুধ দেওয়া হয়, তা দিয়ে সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন মাস কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন করে আর ওষুধ পৌঁছেনি। ফলে দিন দিন সংকট আরও প্রকট হচ্ছে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মধুসূদনপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসাসেবা নিতে রোগীদের ভিড় থাকলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন অনেকে।
স্থানীয় বাসিন্দা একরাম আলী বলেন, বাড়ির পাশে কমিউনিটি ক্লিনিক থাকায় আগে অনেক উপকার পেতাম। অসুস্থ হলে বেশিরভাগ ওষুধ এখান থেকেই পাওয়া যেত। এখন প্রায় সব ওষুধই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। গরিব মানুষের জন্য এটা অনেক কষ্টের।
মধুসূদনপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি নূর আলম বলেন, আমাদের ক্লিনিকে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ জন রোগী আসেন। কিন্তু ওষুধের সরবরাহ না থাকায় আগের তুলনায় রোগীর সংখ্যাও কমেছে। চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ দিতে না পারায় রোগীরা হতাশ হচ্ছেন।
শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের ছয় দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হলেও ওষুধ সংকটের কারণে সেই সেবার কার্যকারিতা অনেকটাই কমে গেছে। চিকিৎসকের পরামর্শ মিললেও ওষুধ না পাওয়ায় রোগীদের শহর বা বাজারের ফার্মেসি থেকে বাড়তি খরচে ওষুধ সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার বেড়াবাড়ী কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি জাকিয়া বলেন, প্রায় পাঁচ মাস ধরে আমাদের ক্লিনিকে কোনো ওষুধ নেই। বর্তমানে ওষুধের মজুত একেবারেই শূন্য। আমরা রোগীদের প্রেসক্রিপশন দিতে পারছি, কিন্তু ওষুধ দিতে পারছি না। শুধু আমাদের ক্লিনিক নয়, গোটা মোহনপুর উপজেলার বেশিরভাগ কমিউনিটি ক্লিনিকেই একই অবস্থা।
একই চিত্র দেখা গেছে বাগমারা উপজেলাতেও। দক্ষিণ জামালপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি সেলিম হোসেন বলেন, বাগমারায় প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ সংকট চলছে। শেষ ওষুধ পেয়েছি গত আগস্ট মাসে। এরপর আর কোনো সরবরাহ আসেনি। এখানে যারা চিকিৎসা নিতে আসেন, তাদের বেশিরভাগই গরিব ও অসহায় মানুষ। ওষুধ না থাকায় তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীর ৯টি উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিকেই একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ফলে তৃণমূল পর্যায়ের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, যারা এসব স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভরশীল, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এস.আই.এম রাজিউল করিম বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে কয়েক মাস ধরেই ওষুধ সরবরাহে সংকট চলছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন কোনো প্রকল্প অনুমোদন না হওয়ায় সরবরাহে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, এই সপ্তাহের মধ্যেই ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।