পবিত্র ঈদুল আযহা যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্যবাহী কামারশিল্পের ব্যস্ততা। দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার কামারপাড়া এখন যেন এক ভিন্ন রূপে জীবন্ত হয়ে উঠেছে আগুন আর ধোঁয়া এবং হাতুড়ির টুংটাং শব্দে মুখর চারপাশ। ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে দা, বটি, ছুরি, চাপাতি ও কাঁচি তৈরির পাশাপাশি পুরোনো সরঞ্জামে নতুন ধার দেওয়ার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কামাররা। কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত করতে দিন-রাত এক করে কাজ করছেন তারা। সোমবার সকালে বীরগঞ্জ পৌর এলাকার স্লুইচগেট রোডের ডাবলু মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, কামার মো. শাহ আলমের কর্মশালায় চলছে ঈদকেন্দ্রিক তীব্র ব্যস্ততা। জ্বলন্ত চুল্লিতে লোহা গরম করে হাতুড়ির আঘাতে তৈরি করা হচ্ছে নতুন দা-বটি। একই সঙ্গে পুরোনো সরঞ্জামে ধার বসাতে ভিড় করছেন ক্রেতারা।কর্মশালার চারপাশে আগুনের উত্তাপ, লোহার ঝনঝন শব্দ আর শ্রমিকদের ঘাম মিলে তৈরি হয়েছে এক বাস্তব জীবনের শিল্পচিত্র, যেখানে জীবিকার সঙ্গে মিশে আছে শত বছরের ঐতিহ্য। কামার মো. শাহ আলম বলেন, ঈদুল আযহার সময় আমাদের কাজ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। আমাদের এখানে ৬ জন কারিগর কাজ করছেন। কেউ নতুন জিনিস বানাচ্ছেন, কেউ আবার পুরোনো সরঞ্জাম শান দিচ্ছেন।তিনি আরও জানান, এই মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে কয়েক হাজার টাকার কাজ হলেও লাভ তুলনামূলকভাবে কম। তবে ঈদের আগে মানুষের প্রয়োজন মেটাতে স্বল্প মুনাফাতেই বিক্রি করতে হয়। স্থানীয়রা জানান, কোরবানির ঈদকে ঘিরে কামারপাড়ায় এখন উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। প্রতিদিনই আশপাশের গ্রাম থেকে শুরু করে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ আসছেন দা, বটি ও ছুরি শান দিতে বা নতুন করে কিনতে। একজন ক্রেতা মো. হামিদ বলেন, ঈদের আগে সব সরঞ্জাম ঠিক করে রাখি। সারা বছর ব্যস্ত থাকায় সময় হয় না, তাই এখন একসঙ্গে সব কাজ করিয়ে নিচ্ছি। ঐতিহ্যবাহী কামারশিল্প শুধু প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরির কাজই নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়লেও ঈদুল আযহার মতো মৌসুমে এখনো দেশীয় কামারশিল্পের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে টিকে আছে।লোহার টুংটাং শব্দে মুখর বীরগঞ্জের কামারপাড়া যেন জানান দিচ্ছে ঈদুল আযহাকে ঘিরে প্রস্তুত হচ্ছে গ্রামীণ জনপদ, যেখানে শ্রম, ঐতিহ্য আর জীবিকার এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে।