আতঙ্কে উপকূলবাসী, পাউবোর বাঁধ কেটে নোনাপানি প্রবেশ

এফএনএস (মহানন্দ অধিকারী মিন্টু; পাইকগাছা, খুলনা) : | প্রকাশ: ২৪ মে, ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম
আতঙ্কে উপকূলবাসী, পাউবোর বাঁধ কেটে নোনাপানি প্রবেশ

খুলনার কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি চাষকে কেন্দ্র করে আবারও বেড়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ও সরকারি রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, একশ্রেণির প্রভাবশালী চিংড়ি ঘের মালিক বেড়িবাঁধ কেটে, পাইপ বসিয়ে এবং জোয়ারের নোনাপানি প্রবেশ করিয়ে অবৈধভাবে ঘেরে পানি তুলছেন। এতে সরকারি কেয়ার রাস্তা, বেড়িবাঁধ ও উপকূলীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রতিবছর বর্ষা, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের সময় এসব দুর্বল বাঁধ ভেঙে জনপদ প্লাবিত হচ্ছে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ছে উপকূলবাসী। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপকূলীয় এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণের জন্য নদ-নদী ও খাল থেকে নোনাপানি প্রবেশ করতে অনেক ঘের মালিক পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধে অবৈধ সংযোগ স্থাপন করছেন। কোথাও কোথাও বাঁধ কেটে বড় পাইপ বসানো হয়েছে। আবার বিভিন্ন মৎস্য লীজ ঘেরে জোয়ার-ভাটার পানির প্রবল ঢেউয়ের কারণে সরকারি কেয়ার রাস্তার পাশ ধসে পড়ছে। ফলে সাধারণ মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে কয়রার মহারাজপুর, উত্তর বেদকাশী, দক্ষিণ বেদকাশী, আমাদী ও পাইকগাছার লতা, গড়ইখালী, দেলুটি, সোলাদানা ও চাঁদখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় বছরের পর বছর এসব অনিয়ম চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। উপকূলবাসী জানান, ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, আম্পান ও সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় রেমালের সময় দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হয় এসব এলাকা। কিছু স্থানে নদ-নদীর লোনাপানি লোকালয়ে ঢ়ুকে হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। তলিয়ে যায় ফসলি জমি, মাছের ঘের ও বসতবাড়ি। নষ্ট হয়ে যায় মিঠা পানির পুকুর ও টিউবওয়েল। দীর্ঘসময় লবণাক্ত পানির কারণে কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ে। ২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে কয়রা ও পাইকগাছার বহু স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে কয়েক মাস পানিবন্দি ছিল হাজারো পরিবার। একইভাবে ২০২৪ সালের ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে উপকূলীয় অনেক দুর্বল বাঁধে ফাটল ও ভাঙন দেখা দেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, যেসব স্থানে অবৈধভাবে পাইপ বসানো বা বাঁধ কাটা হয়েছিল, সেসব এলাকাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্থানীয় সোলাদানার বাসিন্দা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, চিংড়ি ঘেরের জন্য যারা বাঁধ কাটছে, তারা শুধু নিজেদের লাভ দেখছে। কিন্তু বাঁধ ভেঙে গেলে পুরো এলাকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা প্রতি বছর আতঙ্ক নিয়ে জীবনযাপন করি। লতা গ্রামের বাসিন্দা শিউলী মন্ডল বলেন, জোয়ার এলেই ভয় লাগে কখন বাঁধ ভেঙে যায়। আইলা আর আম্পানের সময় আমাদের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। এখনো সেই ভয় কাটেনি। কয়রা রফিক নামের এক কৃষক জানান, নোনা পানি ঢ়ুকে আমাদের জমির ধান নষ্ট হয়ে যায়। মিঠা পানির সংকট তৈরি হয়। কিন্তু যারা বাঁধ কাটে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা হয় না। উপকূল রক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ, অবৈধভাবে নোনাপানি প্রবেশ করানো এবং বাঁধের পাশে ভারী পানির চাপ তৈরি হওয়ায় উপকূলীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও আরও বাড়ছে। দ্রুত নজরদারি, নিয়মিত সংস্কার এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

পানি উন্নয়ন বোর্ড এর কর্মকর্তা রাজু আহমেদ বলেন, সরকারি বাঁধ ও রাস্তা কেটে বা ক্ষতিগ্রস্ত করে কেউ চিংড়ি চাষ করতে পারে না। অথচ এক শ্রেণির অসাধু জনপ্রতিনিধিদের প্রভাবশালী ঘের মালিকরা ম্যানেজ করে রাতের আধারে নদী থেকে নোনাপানি উত্তলন করে চিংড়ি ঘের করার সুযোগ করে দেন। বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। উপকূল রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। বাঁধে অবৈধ পাইপ স্থাপন ও কাটার ঘটনায় অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপকূলীয় বাঁধ সুরক্ষায় নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে। যেসব স্থানে ঝুঁকি রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাইকগাছাস্থ মানবাধিকার উন্নয়ন কেন্দ্রের পরিচালক গত কয়েক বছর ধরে পাইকগাছা পৌরসভার মধ্যে নোনাপানি উত্তলন বন্ধ করার জন্য স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে দেন দরবার করেছেন। তবে বাস্তবে কোন সুফল পাওয়া যায়নি। উক্ত বিষয় পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পাইকগাছা পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র মো: ওয়াশিকুজ্জামান উপজেলা পরিষদ এর আইন শৃঙ্খলা সভায় জানান যে পৌরসভার মধ্যে নোনাপানি বন্ধের জন্য কোন আইন আছে কিনা তা তিনি জানেন না। পরবর্তীতে আইন ও আইনের ধারা উল্লেখ করে তাকে লিখিত ভাবে জানানো হলেও তিনি কোন কার্যকরি ব্যবস্থা নেননি। উপকূল রক্ষার স্বার্থে অবৈধ নোনাপানি প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। না হলে পরিবেশ, কৃষি, সুপেয় পানি ও জনজীবন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। চিংড়ি চাষের নামে পরিবেশ ধ্বংস বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ জরুরি।

উপকূলীয় জনগণের দাবি, চিংড়ি চাষের নামে বেড়িবাঁধ ও সরকারি রাস্তা ধ্বংসের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক অভিযান পরিচালনা, অবৈধ পাইপ অপসারণ এবং টেকসই উপকূল সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে