পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের মানুষের ঘরমুখো যাত্রা আবারও সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ঈদযাত্রা শুরুর দিন থেকে কর্মস্থলে ফেরার সময় পর্যন্ত ১৫ দিনে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৪৪২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৩৮ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৪০ জন। গত বছরের তুলনায় দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা-সবকিছুই বেড়েছে। উন্নয়ন ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের যুগে এ ধরনের পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় শিকার মোটরসাইকেল আরোহীরা। মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৩৯ শতাংশই মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। একই সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ, বেপরোয়া গতি, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া এবং জাতীয় মহাসড়কে অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচল দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, নিহতদের মধ্যে চালক, পরিবহন শ্রমিক, পথচারী, নারী, শিশু ও শিক্ষার্থীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি পরিবহন সমস্যা নয়; এটি এখন জননিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের একটি বড় জাতীয় সংকট। প্রতিবেদনে উল্লিখিত কারণগুলো নতুন নয়। ভাঙাচোরা সড়ক, বৃষ্টিজনিত গর্ত, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, উল্টো পথে চলাচল এবং বিরামহীন ড্রাইভিংয়ের মতো সমস্যাগুলো বছরের পর বছর ধরে আলোচিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঈদকেন্দ্রিক সাময়িক তৎপরতা এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না। বরং প্রতি বছর একই ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে স্বল্পমেয়াদি অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে। চালকদের প্রশিক্ষণ ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, ফিটনেস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন অপসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং মহাসড়কে কার্যকর রোড সাইন ও নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং পরিবহন খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি। ঈদ মানুষের আনন্দের উৎসব। কিন্তু সেই আনন্দ যদি শত শত পরিবারের শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সড়ক নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে সরকার, সংশ্লিষ্ট সংস্থা, পরিবহন মালিক-শ্রমিক এবং সাধারণ নাগরিক-সবার সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই মৃত্যুমিছিল থামাতে।