দেশের সাধারণ মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতি এখনো অন্যতম বড় অর্থনৈতিক উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে উঠেছিল। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, টানা দুই মাস ধরে মূল্যস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরেছে, যা অর্থনীতির জন্য একটি সতর্ক সংকেত। মূল্যস্ফীতির এই বৃদ্ধি শুধু খাদ্যপণ্যে সীমাবদ্ধ নয়; খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই দাম বেড়েছে। মে মাসে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৬ শতাংশে এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে পরিবহন, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবার ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে সীমিত ও স্থির আয়ের মানুষের ওপর চাপ বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে পণ্য ও সেবার প্রায় সব খাতে মূল্যচাপ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানি ব্যয়ের পরিবর্তন দ্রুত বাজারে প্রতিফলিত হয়। উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বহন করতে হয়। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না। মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী চাপ শুধু ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতাই কমায় না, অর্থনৈতিক বৈষম্যও বাড়িয়ে দেয়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করে। ফলে মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ে এসব জনগোষ্ঠীর ওপর। অন্যদিকে, সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। এ অবস্থায় শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করাই যথেষ্ট নয়। বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি, সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা, অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদনে সহায়তা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানি ও পরিবহন খাতে নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি। মূল্যস্ফীতি একটি অর্থনীতির জন্য স্বাভাবিক বাস্তবতা হলেও দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করলে তা জনজীবন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের অন্যতম প্রধান দাবি।