ভৈরবে মাইক্রোস্ট্যান্ডে গাড়ি ভাড়া নিয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষ

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সাড়ে চার ঘণ্টা অচল, আহত অর্ধশতাধিক

এফএনএস (আদিল উদ্দিন আহমেদ; ভৈরব, কিশোরগঞ্জ) : | প্রকাশ: ১১ জুন, ২০২৬, ০৭:২২ পিএম
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সাড়ে চার ঘণ্টা অচল, আহত অর্ধশতাধিক

কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌরসভার মাইক্রোস্ট্যান্ডে ভাড়া সংক্রান্ত তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। (১০ জুন) বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে শহরের কমলপুর এলাকার যুবকদের সঙ্গে দুর্জয়মোড় সংলগ্ন আশপাশের এলাকার যুবকদের মধ্যে এই সংঘর্ষ শুরু হয়। মুহূর্তেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষ মাইকে ঘোষণা দিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। সংঘর্ষের সময় ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দখল করে নেয় উভয় পক্ষ। ফলে সাড়ে ৪ ঘণ্টা যান চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকে। খবর পেয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান শেলী ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় সংঘর্ষে ভৈরব থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ ও একজন পুলিশ সদস্যসহ উভয় পক্ষের অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়। এদের মধ্যে ১৫ জন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। তানভির ও নাইম নামে দুইজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এদিকে ওসি আতাউর রহমান আকন্দকে থানা থেকে প্রত্যাহার কওে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে ।

অপর দিকে সংঘর্ষ ফেরাতে এসে পৌর শ্রমিক দলের সভাপতি মো. সিয়াম মিয়া পুলিশের টিয়ারগ্যাসে আহত হয়। তাৎক্ষণিক তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। সংঘর্ষে অন্যান্য আহতরা স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৭ জুুন বাসস্ট্যান্ড এলাকা কমলপুর মাইক্রোস্ট্যান্ডে কমলপুর এলাকার মাইক্রোচালক আরমানের সঙ্গে দুর্জয়মোড় এলাকার কয়েকজন যুবকের ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটি ও মারামারির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা থেকেই যায়। বরং মীমাংসার সময়ও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়, যা পরবর্তীতে সংঘাতের বীজ বপন করে। 

এরই ধারাবাহিকতায় ১০ জুন বিকেল থেকেই পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, বিকেলের দিকে দুর্জয়মোড় সংলগ্ন এলাকার একদল যুবক কমলপুর এলাকার মাইক্রোস্ট্যান্ড ও আশপাশের দোকানপাটে হামলা চালায়। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দেয়। অনেক দোকানদার ভাঙচুর ও লুটপাটের ভয়ে দোকান বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে চলে যান।

স্থানীয়দের দাবি, বিকেলে ওই হামলার পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা একাধিকবার চেষ্টা করলেও তারা ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উভয় পক্ষ দা, বল্লম, রড, লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পরপরই কমলপুর ও দুর্জয়মোড় এলাকার সড়কের দুই পাশে থাকা একাধিক দোকানপাট ভাঙচুর করা হয়। কিছু দোকানে লুটপাটের অভিযোগও পাওয়া গেছে। 

দোকান মালিকরা জানান, তারা জীবন বাঁচাতে দোকান ছেড়ে পালিয়ে যান এবং পরে ফিরে এসে ভাঙচুরের চিত্র দেখতে পান। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা ঘরবাড়ি থেকে বের হতে সাহস পাননি। অনেকে দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেন। সংঘর্ষের সময় উভয় পক্ষ একে অপরকে ধাওয়া করে এবং মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।

সংঘর্ষ চলাকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক সড়কের ভৈরব অংশে যান চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এতে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। শত শত যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক ও ব্যক্তিগত যানবাহন আটকে পড়ে। যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থেকে চরম দুর্ভোগের শিকার হন। অনেকে বাধ্য হয়ে গাড়ি থেকে নেমে নিরাপদ স্থানে চলে যান।

পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে একাধিকবার চেষ্টা করলেও সংঘর্ষকারীদের ব্যাপক উপস্থিতি, উত্তেজনা ও দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। পরবর্তীতে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ লাইন্স থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এনে মোতায়েন করা হয় এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালানো হয়। এ ঘটনায় ভৈরব থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ ও একজন পুলিশ সদস্যসহ উভয় পক্ষের অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহতদের স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

সংঘর্ষের সময় ঘটনাস্থলে থাকা একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, পুরো এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পরিস্থিতিতে পরিণত হয়েছিল। মানুষ প্রাণ বাঁচাতে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছিল। মহাসড়কের যান চলাচল বন্ধ থাকায় জরুরি অ্যাম্বুলেন্সও আটকে পড়ে। এদিকে সংঘর্ষের খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। তবে রাতের দীর্ঘ সময় ধরে উত্তেজনা চলতে থাকে।

কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান শেলী  বলেন, মাইক্রোস্ট্যান্ডের তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১০ জুন বিকালে দুইটি পক্ষ সংঘর্ষের চেষ্টা করলে আমরা তাদের চত্রভঙ্গ করতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে রাতে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়ালে প্রথমে থানা পুলিশ ব্যর্থ হলে পরে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স এসে সহজে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করি। দুই পক্ষের উত্তেজনা বেশি থাকায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে ১৫ রাউন্ড টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়। সাথে সাথে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। 

তিনি আরো বলেন, সন্ধ্যা থেকে সংঘর্ষকারীদের সাথে প্রচুর ইটপাটকেল থাকায় পুলিশ তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনতে গিয়ে ভৈরব থানার ওসিসহ দুইজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে। ওসির প্রত্যাহারের কথা অস্কিার করে নিয়ামত বদলীর কথা বলে জানান ,এঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি তবে অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে