সোমবার হাঁড়িভাঙ্গা আম আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত শুরু

এফএনএস (মমিনুল ইসলাম রিপন; রংপুর) : | প্রকাশ: ১৫ জুন, ২০২৬, ১২:১৬ এএম
সোমবার হাঁড়িভাঙ্গা আম আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত শুরু

ভিন্নরকম স্বাদের কারণে ভোক্তাপ্রিয় রংপুরের হাঁড়িভাঙ্গা আম আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে আসছে আজ সোমবার ( ১৫ জুন)। কিন্তু কৃষক-ব্যবসায়ীদের মধ্যে অস্বস্তির শেষ নেই। একদিকে ফলন কম। অন্যদিকে যে হাট থেকে বেচাবিক্রি হয় হাঁড়িভাঙ্গা, সেই পদাগঞ্জ হাটের অবস্থা সামান্য বৃষ্টিতে করুণ কাদাময়। আশেপাশের বাইপাস সড়কগুলোও কর্দমাক্ত। জিআই পণ্যের স্বীকৃতি আছে শুধু কাগজে কলমে। ফলে ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে শংকা কাটছে না চাষীদের। 

জিআইপন্যের স্বীকৃতি পাওয়া হাঁড়িভাঙ্গার রাজধানী পদাগঞ্জ বাজারের প্রবেশমুখ কর্দমাক্ত।  বৃষ্টি আসলেই কাদাজলে একাকার। বেচাবিক্রির কোন পরিবেশ থাকে না। হাটের মাঠ ছাপিয়ে প্রধান সড়কটির প্রায় দেড়কিলোমিটার জুড়ে হয় বেচাবিক্রি। ড্রেন না থাকায় দুইধারের বেচাবিক্রিতে কাদাময় হয়ে উঠে হাঁড়িভাঙ্গা। অথচ এই হাট থেকেই এবার ৩০০ কোটি টাকার আম বেচাবিক্রির লক্ষমাত্রা কৃষি বিভাগের। 

সরেজমিনে হাটটিতে কথা হয় খুচরা পাইকারী অনলাইন ব্যবসায়ি, চাষী লীজি চাষীদের সাথে। তারা তুলে ধরেন হাট এবং আশেপাশের রাস্তাঘাটের করুণ পরিনতির কথা। অনলাইন ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান  জানান,  ‘ আমি অনলাইনে হাঁড়িভাঙ্গা সারাদেশে সেল করি। কিন্তু রংপুর থেকে হাটে আসার প্রধান সড়ক নজিরের হাট -টু পদাগঞ্জ সড়কের অবস্থা বেহাল। আমাদেরকে ঘুরে আসতে হয় ১০ কিলোমিটার। আবার হাটে এসে হাটু কাদা। কিভাবে ব্যবসা করবো।’

চাষী আমিনুল ইসলাম জানালেন, ‘ একটু বৃষ্টি হলেই আম নিয়ে আসা আমাদের কস্ট হয়। হাটের প্রবেশমুখেই হাটু কাদা। যেসব রাস্তা দিয়ে আম আনি সেগুলোও ভালো না। চরম ভোগান্তি করে বেচাবিক্র করা লাগে। যদি ড্রেনেজ সিস্টেম করা যেতো তাহলে ভালো হতো। প্রতিবছরই আমরা বলি। কিন্তু কোন কাজ হয় না। 

হাটের প্রবেশ মুখে আরেক চাষী সাজ্জাদ মন্ডল কাদায় দাড়িয়ে ছিলেন, ভ্যান নিয়ে। তিনি জানালেন, ‘ অসুবিধা মানে অনেক অসুবিধা।  যদি ড্রেন থাকতো তাহলে ভালো হতো। এমনিতেই দাম কম। কাদার কারণে আরও কম দামে আম বিক্রি করা লাগে। এখন উপায় তো নাই। কত আর বলি।’

স্থাণীয় ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান জানালেন, একহাটু কাদায় দাড়িয়ে আছি আম নিয়ে।  সামান্যবৃষ্টি হওয়াতেই এই অবস্থা। আরও বেশি বৃষ্টি হলে অবস্থা কাহিল হবে। আমচত্বর থেকে মন্ডলপাড়া মোড় পর্যন্ত এককিলোমিটা সড়কের  দুই ধারে যদি ড্রেনস থাকতো। তাহলে আমাদের কোন দুর্ভোগ থাকতো না। 

 সরেজমিনে দেখা গেছে দেদারছে আমের টোল আদায় করা  হচ্ছে। ক্উাকেই ছাড় দেয়া হচ্ছে না। আমের মওসুমে ইজারাদারদের টোল দিতে হয় আরও বেশি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারী এবং অনলাইন ব্যবসায়িরা আসেন। লাখ লাখ টাকা সরকারের রাজস্বফান্ডে গেলেও উন্নয়ন হয়না হাটটির। এতে ক্ষুব্ধ সবাই। 

ছামিউল ইসলাম নামের একজন চাষী  জানালেন,   ‘মাল নিয়ে আসলে বৃষ্টিতে কাঁদার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। আমরা তো নিয়মিত তেল দেই। প্রতিবছর  ডিসি সাহেব, ইউএনও সাহেব, চেয়ারম্যান সাহেব, ইজারাদার আশ্বস্ত করেন। কিন্তু  কাজ হয় না। ওনারা আসেন আশ্বস্ত করের, চলে যান। কিন্তু অসুবিধা আগের মতোই থাকে। কারা এই হাটের উন্নয়ন করবে আমরা বুঝি না। 

ঢাকা থেকে আসা মোহাম্মদ আবু হাসান নামের  এক ব্যবসায়ী জানান, ‘ এই হাট থেকে শত শত কোটি টাকার হাঁড়িভাঙ্গা আম বেচাবিক্রি হয়। আমার মতো শত শত পাইকারী ব্যবসায়ী এখানে আসেন। কিন্তু হাটটির কোন উন্নতি হলো না। অথচা আমরা ডাবল অনেক সময় তিনডাবল টোল দিচ্ছি। একমন আমন কিনলে ৪ টা আম তারা টোল হিসেবে নিচ্ছে। কিন্তু ইজাবদারেরা কোনো ব্যবস্থা নেয় না।’ 

 অনলাইন ব্যাবসায়ী জেসমিন আখতার বলেন, ‘ আমি প্রতিবছর এই হাট থেকে ১০০ ট৬নেরও বেশি আম অনলাইনে সরবরাহ করি। কিন্তু হাটে কেনাবেচার কোন পরিবেশ নেই। কাদামাটি দিয়ে একাকার। হাটের অনেক অবস্থা খারাপ। গাড়ি চলাচলে অনেক সমস্যা। পোশাক আশাক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।  গাড়িগুলো হেনস্থার শিকার হচ্ছে। এই সময়ে ইজারাও বেশি দেওয়া হয়।  এতা টোল দেয়ার পরও আমরা ব্যবসায়িরা সুবিধা পাচ্ছি না। 

চাষি সাগর মিয়া জানান, ‘ হাটের কোন উন্নতি নাই। রাস্তা এবং প্রবেশ মুখ সবখানে কাদা। হাাটের ভিতরের পশ্চিমপাশে গলা পর্যন্ত পানি। প্রত্যেক বছর সবাই আশ্বাস দেয়। কিন্তু কাজ করে না। প্রশাসন কেন হাটটির ব্যপারে নজর দেয় না, বুঝিনা । ইজারাদাররা তো আম আর টাকা তোলা নিয়ে ব্যস্ত। 

লীজি চাষী ফখরুল ইসলাম জানান, ‘ শত শত কোটি কোটি টাকার হাড়িভাঙ্গা আম বেচাবিক্রি হয় পদাগঞ্জ হাট থেকে। এখানে একটা শেড নাই।  বাথরুমের ব্যবস্থা নেই। বছরের পর বছর  অসুবিধার মধ্যেই স্থাণীয় ও বাইরের ব্যবসায়িরা এখান থেকে আম কিনছেন।  ক্রেতা শাফিউল ইসলাম শাফি জানান, ‘ জিআই পন্যের স্বীকৃতি পেয়েছে হাড়িভাঙ্গা। কিন্তু এটার রপ্তানির আলোচনা আমরা শুনি না। বাজারব্যবস্থাপনাও খুব নাজুক। সরকারের উচিৎ দ্রুত আমটি রপ্তানীর মাধ্যমে চাষীদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা। 

 তবে হাটের ইজারাদাররা দোষ চাপিয়েছেন  ইউএনও ও চেয়ারম্যানের ওপর। এবার ৫৬ লাখ টাকায় ডাক হয়েছে এটি। পার্টনারশিপে ১৬ জন হাটটি ডেকে নিয়েছেন। তাদের একজন মানিক মিয়া।

তিনি জানান, ‘ রাস্তার দুইধারে ড্রেন এবং হাটে রাবিশ ও ইট ফেলানোর জন্য আমিরা লিখিত আবেদন করেছি চেয়ারম্যান ও ইউএনও এর কাছে। কিন্তু তারা কোন ভ্রুক্ষেপ নেয় না। আমরা তাদের কাছে একাধিকবার গেছি। কিন্তু তারা কথা শোনে না। আমরা নিজেরা যতটুকু পারি কোনমতে মাটি দিয়ে হাটটা চালু রেখেছে। ব্যবসায়ী ও চাষীরা সামান্য বৃষ্টি হলেই চরম অসুবিধায় পড়েন।’ 

এ ব্যপারে মিঠাপুকুরের ইউএনও মোঃ পারভেজ জানান, ‘ হাটটির উন্নয়নের সব দায়িত্ব চেয়ারম্যানের। এজন্য চেয়ারম্যানকে বরাদ্দে দেয়া হয়। তিনি কেন  এ ব্যপারে উদাসিন জানি না। দ্রুত হাটটির সংস্কার ও অবকাঠামো নির্মান জরুরী।

একদিকে হাটের এমন দশায় বাজারজাতে অন্তহীন সমস্যা। অন্যদিকে এপ্রিলের শেষ দিকে শিলাবৃষ্টিতে ৩০-৩৫ ভাগ আম ঝড়ে যাওয়া। বৃষ্টিতে আমের রং নস্ট হওয়া, কালোদাগ পড়া; সাথে ফেটে যাওয়া। সব মিলে ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে শংকিত চাষী ব্যাবসায়ীরা। এরই মধ্যে সোমবার (১৫ জুন) থেকে শুরু হচ্ছে হাঁড়িভাঙ্গার আনুষ্ঠানিক বাজারজাত। যদিও ১০ জুন থেকেই আম বেচাবিক্রি শুরু হয়েছে। অনেক বাগানের আম রাখা যাচ্ছে না। পেকে যাওয়ায় তারা বিক্রি শুরু করেছেন। আবার বৃষ্টির কারণে  আমের রং নস্ট হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর কাংখিত দামও পাচ্ছে না কৃষক।  মন্ডলপাড়ার আম বাাগানে আম ছিড়ছিলেন বাগান মালিক মাহফুজুর রহমান নয়ন। এটা তাদের নিজস্ব বাগান। নিজেরাই আবাদ করেন। তিনি জানান, ‘ বাজারটা খুব আপডাউন। এবার ফলন কম হয়েছে। এবার বৃষ্টির কারণে আমের কালারও নাই। সেকারণে বাজারটা ভালো না। প্রকারভেদে ১৪০০ থেকে ১৮০০ এর মধ্যেই বিক্রি করছি। আশাকরি সামনে বাজার ভালো হবে। আশাকরি আকাশ ভালো হলে দাম বাড়বে ‘  এই বাগানেই কথা হয় মাহমুদা বেগম নামের এক কৃষানীর সাথে। তিনি জানান, শিলাবৃষ্টির কারণে ৩০-৩৫ ভাগ আম পরে গেছে। ফলনও কম হয়েছে। বৃষ্টির কারণে কালারও ঠিক থাকছে না। দামও কম করছে। এর আগের বছরগুলোতে এই সময়ে ২৪০০ থেকে ২৮০০ টাকা মন বিক্রি করেছি। এবার এখনও ১৬০০ টাকা মন দরেও বিক্রি করতে পারছি না।  কৃষি সম্প্রসারণ রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, ‘ শিলাবৃষ্টিতে হাঁড়িভাঙ্গা ঝড়ে পড়লেও ফলন ভালো হয়েছে। আকার বড় হয়েছে। তাই কৃষকরা পুষিয়ে উঠতে পারবেন। এবার ৩০০ কোটি টাকারও বেশি হাঁড়িভাঙ্গা বেচাবিক্রি হবে। যা এই অঞ্চলের প্রান্তিক অ র্থনীতিকে সম্মৃদ্ধ করবে।’  সব ছাপিয়ে সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে হাঁড়িভাঙ্গার আনুষ্ঠানিক বাজারজাত। ফলন কম হলেও মুল্য পাওয়ার আসা জেলা প্রশাসক রংপুরের ডিসি মোহাম্মদ রুহুল আমিনের। তিনি জানান, হাঁড়িভাঙ্গা জিআই পন্য সোমবার দুপুরে ১২ টায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত কার্যক্রম শুরু করবো। যেহেতু এবার একটু ফলন কম হয়েছে। সুতরাং আমের বাজারমূল্য এবার চাষীরা ভালোই পাাবেন বলে আমি মনে করি।

তিনি জানান, অবকাঠামোগত যে অসুবিধা, ব্যাংকিংসহ রাস্তাঘাট এবং নিরাপত্তা সেসব বিষয় আমাদের নজরে এসেছে। কিভাবে এগুলোর সমাধান  করা যায় তা নিয়ে আমরা কাজ করছি। এছাড়াও রপ্তানীর ক্ষেত্রের প্রতিবন্ধিকতাগুলোও আমরা দূর করার চেস্টা করছি।  ২০২৪ সালের ১২ এপ্রিল জিআই বা  ভৌগলিক পণ্যের স্বীকৃতি পায় হাঁড়িভাঙ্গা আম। ‘

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে