৪০০ বছরের ইতিহাস, বিলীন হতে বসা এক ‘নবরত্ন’ রাজপ্রাসাদ

এফএনএস (এস.এম. শহিদুল ইসলাম; সাতক্ষীরা) : | প্রকাশ: ২১ জুন, ২০২৬, ১২:৩৮ এএম
৪০০ বছরের ইতিহাস, বিলীন হতে বসা এক ‘নবরত্ন’ রাজপ্রাসাদ

চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে মধ্যযুগীয় পুরাকীর্তির ধুলোবালি মাখা ইতিহাস। ছাদপ্রান্ত ধনুকের মতো বাঁকা, কোণগুলো কৌণিক, আর দেয়ালজুড়ে টেরাকোটার প্রাচীন কারুকাজ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোনো এক রাজকীয় পিরামিড আপন মহিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এটি সাতক্ষীরা সদর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে, কলারোয়া উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা সোনাবাড়িয়া গ্রামের ঐতিহাসিক ‘শ্যামসুন্দর মঠ-মন্দির’। প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই পুরাকীর্তিটি আজ চরম অযত্ন, অবহেলা আর সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের মুখে পড়েছে। অথচ সরকারি সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ পেলে এটি হতে পারত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।

ইতিহাসবিদ সতীশ চন্দ্র মিত্র এবং গবেষক অধ্যাপক মো. আবু নসরের বইয়ের পাতা ওল্টালে জানা যায়, ১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দে জনৈক হরিরাম দাশ (মতান্তরে দুর্গাপ্রিয় দাশ) এই নবরত্ন মন্দিরটি নির্মাণ করেন। প্রায় ৬০ ফুট উঁচু, তিনতলা বিশিষ্ট এই মূল মন্দিরের ছায়াসঙ্গী হয়ে রয়েছে একটি দুর্গা মন্দির ও একটি শিব (অন্নপূর্ণা) মন্দির। মন্দিরের ঠিক সামনেই শান্ত জল নিয়ে শুয়ে আছে ‘জমির বিশ্বাসের পুকুর’ নামে একটি ঐতিহাসিক দীঘি।

স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতি হাতড়ালে জানা যায়, এক সময় এই মন্দিরের দোতলায় শোভা পেত স্বর্ণের রাধা-কৃষ্ণ মূর্তি এবং পূর্ব দিকে পরম শ্রদ্ধায় রাখা ছিল কষ্টিপাথরের তৈরি ১২টি শিবলিঙ্গ। লোকশ্রুতি রয়েছে, ভারতের বিখ্যাত রানী রাসমণি এবং শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও এক সময় এই মন্দিরের আঙিনায় পা রেখেছিলেন, অবস্থান ও পূজা-অর্চনা করেছিলেন।

তবে কালের নিষ্ঠুর বিবর্তনে মন্দিরটির জাঁকজমক আজ শুধুই সোনালী অতীত। দেশ স্বাধীনের পর অন্ধকার রাতে একে একে চুরি হয়ে গেছে কষ্টিপাথরের মূল্যবান শিবলিঙ্গ এবং স্বর্ণের মূর্তিগুলো। বর্তমানে মন্দিরটির দেয়াল খসে পড়ছে, আগাছা আর পরগাছায় ঢেকে গেছে এর কার্নিশ। যেন এক প্রাচীন বৃদ্ধ একা দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলছে। মন্দিরের সেবাইত সুবপ্রসাদ চৌধুরী আক্ষেপ করে বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষেরা বহু বছর ধরে এখানে পূজা দিয়ে আসছেন। এখনো চৈত্র সংক্রান্তি বা দুর্গাপূজায় কষ্ট করে নানা আয়োজন করা হয়। কিন্তু ভবনের যে ভঙ্গুর দশা, তাতে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর। অন্যদিকে, মন্দিরের সভাপতি দেবপ্রিয় চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সংস্কারের অভাবের পাশাপাশি এখানে এখন মাদকসেবীদের উপদ্রব ও বখাটেদের অসামাজিক কার্যকলাপ বেড়েছে। প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো হুমকির মুখে পড়তে হয়।

এই প্রাচীন ঐতিহ্য রক্ষায় গত কয়েক বছরে পরিদর্শনের কোনো কমতি ছিল না। ২০১৪ সালে ভারতের তৎকালীন ডেপুটি হাইকমিশনার সন্দীপ চক্রবর্তী, ২০২২ সালে সহকারী হাইকমিশনার রাজেশ কুমার রায়না এবং হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব ডা. দীলিপ কুমার ঘোষসহ জাহাঙ্গীরনগর ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল মন্দিরটি পরিদর্শন করেছেন। প্রত্যেকেই দ্রুত সংরক্ষণের আশ্বাস দিলেও, বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির ফুল আজও ফোটেনি।

অবশ্য আশার বাণী শুনিয়েছেন খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক মো: মহিদুল ইসলাম। তিনি জানান, এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেটভুক্ত একটি প্রাচীন নিদর্শন। আগে এটি শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় থাকলেও এখন তা স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্থাপনাটির পোড়ামাটির অলংকরণ, ইটের নির্মাণ কৌশল এবং নান্দনিক নকশা মধ্যযুগীয় মন্দির স্থাপত্যের অনন্য বৈশিষ্ট্য বহন করে। এই অলংকরণে ধর্মীয় কাহিনী, ফুল-লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশার মাধ্যমে চমৎকার শিল্পনীতির প্রতিফলন ঘটেছে। অধিদপ্তর এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে এবং আগামী অর্থ বছরে বরাদ্দ নিয়ে সংস্কার ও সংরক্ষণের কাজ শুরু হবে, যাতে মন্দিরের এই জরাজীর্ণ দশা আর না থাকে।

 শত বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অনন্য সাক্ষী এই শ্যামসুন্দর মঠটি এখন কোনো রকমে টিকে আছে ভাঙা দেয়াল আর স্মৃতির ওপর ভর করে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ যদি এখনই দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেয়, তবে হয়তো আগামী প্রজন্মের কাছে এই নবরত্ন মন্দিরের অস্তিত্ব কেবল ইতিহাসের বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে। তাই স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের এখন একটাই আকুল দাবি-কাগজে-কলমে আর আশ্বাস নয়, দ্রুত বাস্তব উদ্যোগে বাঁচিয়ে তোলা হোক এই প্রাচীন প্রাণস্পন্দনকে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে