পরিবেশ আদালতের সীমাবদ্ধতায় বাড়ছে বিচারহীনতা

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২১ জুন, ২০২৬, ০৮:১৫ এএম
পরিবেশ আদালতের সীমাবদ্ধতায় বাড়ছে বিচারহীনতা

বাংলাদেশের পরিবেশগত বিপর্যয় এখন আর কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়, বরং প্রতিদিনের নির্মম বাস্তবতা। বিষাক্ত বাতাস, দূষিত নদী, পাহাড় কাটা আর নিষিদ্ধ পলিথিনের অবাধ ব্যবহার জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেললেও দেশের পরিবেশ আদালতগুলো পার করছে এক অদ্ভুত নীরবতা। বৈশ্বিক এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স ২০২৪ অনুযায়ী, ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫তম। অথচ বিশেষায়িত আদালতগুলোতে পরিবেশ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা অবিশ্বাস্য রকম কম। প্রতিদিন হাজারো অপরাধ ঘটলেও বিচারিক খতিয়ানে তার প্রতিফলন নেই। আইনগত সীমাবদ্ধতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং আদালতের সংকটের কারণে এই বিশেষ আইনি ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ঢাকার মূল পরিবেশ আদালতের পরিসংখ্যানই এই স্থবিরতার প্রমাণ। বর্তমানে বিচারাধীন আট হাজারের বেশি মামলার মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আসল মামলা মাত্র ১৩২টি। অর্থাৎ প্রায় ৯৮ শতাংশ মামলাই অন্য অপরাধ সংক্রান্ত। আরও উদ্বেগজনক হলো, বিগত দুই বছরে নতুন করে যুক্ত হওয়া মামলার সংখ্যা এক অঙ্কের ঘরও পার করতে পারেনি। গত দুই দশকে দায়ের হওয়া মামলার এই নগণ্য সংখ্যা প্রমাণ করে, পরিবেশ ধ্বংসের গতি যত দ্রুত, অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রক্রিয়া ততটাই ধীর। উচ্চতর আপিল আদালতেও একই চিত্র- পরিবেশ সংক্রান্ত আপিল মামলাগুলো বছরের পর বছর এক অঙ্কেই আটকে আছে। জানা যায়, এই বিচারিক খরার মূল কারণ ২০১০ সালের পরিবেশ আদালত আইনের কাঠামো। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, কোনো সাধারণ নাগরিক বা ভুক্তভোগী সরাসরি আদালতে মামলা করতে পারেন না। প্রথমে পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করতে হয় এবং তাদের তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন ছাড়া আদালত কোনো মামলা গ্রহণ করে না। এই বাধ্যতামূলক প্রশাসনিক ফিল্টার সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার পথকে অবরুদ্ধ করেছে। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও তদন্তের ধীরগতির কারণে অপরাধের তাৎক্ষণিক আলামত নষ্ট হয়ে যায়, ফলে মানুষ মাঝপথেই সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। অন্যদিকে, নিয়মিত মামলার সংকটের পেছনে পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালতনির্ভরতাও দায়ী। অবৈধ প্রতিষ্ঠান বা ইটভাটায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে সাময়িক জরিমানা আদায় করা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কোনো স্থায়ী ভীতি তৈরি করতে পারছে না। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্পট ফাইন কেবল তাৎক্ষণিক সমাধান দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী অপরাধ ঠেকাতে নিয়মিত বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই। আদালতের স্থায়ী রায় ভবিষ্যতের জন্য নজির তৈরি করে এবং বড় অপরাধীদের শাস্তির মুখোমুখি করে, কিন্তু পরিবেশ আদালতের নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোতে কারাদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তির নজির বিরল। এদিকে, জনসংখ্যার অনুপাতে আদালতের অপ্রতুলতাও সংকটকে ঘনীভূত করেছে। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে বর্তমানে মাত্র তিনটি পরিবেশ আদালত- ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে। অথচ পরিবেশগত অপরাধ এখন গ্রামীণ ও জেলা পর্যায়েও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের পক্ষে বিভাগীয় শহরে এসে মামলা পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব। এর ওপর পরিবেশ আইন বিষয়ে দক্ষ আইনজীবীর অভাব এবং বায়ু বা শব্দদূষণের মতো ক্ষণস্থায়ী অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা বিচার ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করেছে। পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে পরিবেশ আদালতকে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে সাধারণ নাগরিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর জন্য উন্মুক্ত করা জরুরি। আইনদের মতে, বিচারপ্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি প্রতিটি জেলায় বিশেষায়িত পরিবেশ আদালত স্থাপন এবং বিসিএস ক্যাডারে একটি স্বতন্ত্র ‘পরিবেশ ক্যাডার’ চালু করা সময়ের দাবি। প্রতিটি উপজেলায় নির্দিষ্ট পরিবেশ কর্মকর্তা থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধ শনাক্তকরণ ও প্রমাণ সংগ্রহ সহজ হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ রক্ষা কেবল কোনো মন্ত্রণালয়ের দাপ্তরিক কাজ নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার। সরকার ভুক্তভোগীদের সরাসরি মামলা করার সুযোগ দিয়ে আইন সংশোধনের প্রস্তাব বিবেচনা করে দ্রুত বাস্তবায়ন না করলে দূষণ বাড়তেই থাকবে, আর পরিবেশ আদালতগুলো কার্যত শূন্যই থেকে যাবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে